স্বপ্নের রাজ্য দার্জিলিং

479
ছবি: সংগৃহীত

”শৈল শহরের রানী” নামে পরিচিত ভারতের দার্জিলিং, হিমালয়ে অবস্থিত এবং চা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত, দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে, যা একটি (ইউনেস্কো) বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। দার্জিলিং তার অনাবিল সৌন্দর্য এবং মনোরম জলবায়ুর কারণে একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর স্থান হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাংলাদেশী হিসাবে প্রতিবেশী দেশের কোনো জায়গায় ঘুরতে গেলে যে কয়টা নাম মনে আসে তার মধ্যে দার্জিলিং অন্যতম। যারা পাহাড় ভালবাসেন, মেঘের নানা রং দেখতে আগ্রহী তারা যেতে পারেন দার্জিলিং।

যাতায়াত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভোর নগরী পাহাড়ে ঘেরা অপূর্ব চিরহরিৎ ভূমির দার্জিলিংয়ে যেতে পারেন দুইপথে। আকাশপথ কিংবা সড়কপথ। উড়ে যেতে চাইলে প্রথমে ঢাকা থেকে যেতে হবে কলকাতায়। জেট এয়ার, এয়ার ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ বিমান ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ এই সেবা দিয়ে থাকে, এই সময়ে খরচ পড়বে ১১ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা। কলকাতা থেকে আবার বাস, ট্রেন বা বিমানে যেতে হবে শিলিগুড়ি। সেখান থেকে জিপে যেতে হবে দার্জিলিং। সময় লাগবে প্রায় আড়াই ঘন্টা। ভাড়া পড়বে ১৪০ রুপি বা ১৬০ টাকা।

সড়কপথে রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি দার্জিলিং যেতে চাইলে উত্তরবঙ্গের বুড়িমারি সীমান্ত অতিক্রম করে যাওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। ঢাকার গাবতলী থেকে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে উত্তরবঙ্গের বুড়িমারী সীমান্তের উদ্দেশে। ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস থেকে পাসপোর্টে নির্দিষ্ট সময়ের ভিসা নিয়ে রাত ১০টার সুপার সেলুন চেয়ার কোচে উঠে পড়ুন বুড়িমারী সীমান্তের উদ্দেশে। ভাড়া জনপ্রতি আর কত সামর্থের মধ্যেই। ভোর ৭টা নাগাদ আপনি অনায়াসে পৌঁছে যাবেন বুড়িমারী চেকপোস্টে। ইমিগ্রেশন অফিসের কাছেই সব বাস থামে। প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পন্ন করে নিন ভ্রমণ কর ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া। অবশ্য আপনি চাইলে ঢাকা থেকেই ভ্রমণ কর প্রদান করে যেতে পারেন সোনালী ব্যাংকের যে কোন শাখায়। বুড়িমারী অতিক্রম করে ওপারে চ্যাংড়াবান্দা সীমান্তে পৌঁছে একইভাবে সম্পন্ন করে নিন আপনার ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া। ও ভালো কথা, আপনার বহনকৃত ইউএস ডলার চ্যাংড়াবান্দায় অবস্থিত সরকার অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকেই ভারতীয় মুদ্রায় পরিবর্তন করে নেবেন। অন্যথায় পরবর্তী সময়ে টাকা ভাঙাতে আপনাকে বেশ বেগ পেতে হবে।

চ্যাংড়াবান্দা থেকে সরাসরি ময়নাগুড়ির বাস ধরে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন শীর্ষেন্দু-সমরেশের উপন্যাসখ্যাত শিলিগুড়ি জিপ স্টেশনে। ভাড়া জনপ্রতি ৭০ ভারতীয় রুপি। সেখান থেকে ঝটপট ১২০ ভারতীয় রুপির বিনিময়ে সংগ্রহ করে নিন দার্জিলিংগামী কমান্ডার জিপের টিকিট। হাতে শীতের পোশাক নিয়ে বসে পড়–ন আপনার নির্ধারিত আসনে। ব্যস, মাত্র আড়াই ঘণ্টায় আপনি পৌঁছে যাবেন মেঘের দেশ স্বপ্নিল ভুবনের দার্জিলিংয়ে।

তাছাড়া কলকাতা থেকে যেতে চাইলে আপনাকে শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটের দার্জিলিং মেল ধরতে হবে। টিকিট সংগ্রহ করবেন ট্যুরিস্টদের জন্য নির্ধারিত কাউন্টার ফেয়ারলি প্যালেস থেকে। অতঃপর প্রায় ৫৭৬ কিলোমিটার অর্থাৎ ১৪ ঘণ্টার এক ট্রেন ভ্রমণ করে পরদিন সকাল ১০টা নাগাদ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। স্টেশন থেকে প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে রিকশাযোগে চলে আসুন শিলিগুড়ি জিপ স্টেশনে। ১০-১২ রুপি ভাড়া পড়বে। সেখান থেকে ওই কমান্ডার জিপে চড়ে পৌঁছে যেতে পারেন স্বপ্নপুরী দার্জিলিংয়ে।


দার্জিলিংয়ে থাকা
যেহেতু পর্যটন এলাকা হিসেবে খ্যাত, তাই দার্জিলিংয়ে থাকার জায়গার কমতি নেই। পুঞ্জীভূত মেঘের কণা ভেদ করে আঁকাবাঁকা পথের ধারে পুরো দার্জিলিং শহরে রয়েছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল। এর মধ্যে বেলভিউ, সাগরিকা, সোনার বাংলা, মহাকাল হোটেলগুলোই ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বেশি জনপ্রিয়।

মাঝারি মানের হোটেলগুলোয় প্রতিটি সিঙ্গেল রুমের এক দিনের ভাড়া পড়বে প্রায় ১ হাজার রুপি। ডাবল রুম হলে আসবে ১ হাজার ২শ’ রুপি। তিন বেডের রুমও আছে, ভাড়া দিন প্রতি ১ হাজার ৫শ’ রুপি। তবে আরও ভালোমানের হোটেল চাইলে রুমভেদে গুনতে হবে ১ হাজার ৮শ’ থেকে ২ হাজার ৫শ’ রুপি পর্যন্ত। এক রুমে কতজন থাকবেন তা নিয়ে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই হোটেলগুলোতে।

প্রায় প্রতিটি হোটেলেই রয়েছে দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে বেড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় জিপ, সার্বক্ষণিক গরম পানির ব্যবস্থা, ঠাণ্ডা প্রতিরোধে ওষুধসহ যে কোন মুহূর্তে যে কোন সমস্যার তাৎক্ষণিক সেবা।

দার্জিলিংয়ে খাওয়াদাওয়া
ভোজনরসিকদের জন্য বেশ উপযোগী ও সাশ্রয়ী স্থান দার্জিলিং। ভারতীয় খাবারের সবকিছুই পাবেন এখানে। রেস্তোরাঁয় বসে খেলে খরচটা বেশি। তবে ‘স্ট্রিট ফুড’ও খারাপ নয়। অসংখ্য খাবারের মধ্যে চিকেন মোমো, পানি ফুচকা, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, চিকেন ও মাটন নুডুলস ইত্যাদি সবচাইতে বেশি জনপ্রিয়। চিকেন মম খেতে লাগবে ৩০ রুপি। পানি ফুচকা ১০ রুপি থেকে ২০ রুপি। আর হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি ৮০ থেকে ১২০ রুপি।

সব রেস্তোরাঁতেই নুডুলস পাওয়া গেলেও, পেট পুরে খেতে চাইলে যেতে হবে ম্যাল’য়ে। রেস্তোরাঁর তুলনায় এখানে নুডুলসের দামটা যেমন কম, পরিমাণেও বেশি দেয়। চা খেতে রেস্তোরাঁয় বসার চাইতে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলোতে ঢোকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর চা-পাতা কিনতে হলে অবশ্যই ম্যাল থেকে কিনতে হবে।


ঘোরাঘুরি
দার্জিলিং ঘুরতে যানবাহনের অভাব হবে না। প্রত্যেক হোটেলের সামনেই পাবেন গাড়িসহ ট্যুর গাইড। যে কোনো তথ্য বা দিক নির্দেশনার জন্য আছে পর্যটন অফিস। দল ভারি হলে রিজার্ভ গাড়ি নিয়ে ফেলতে পারেন। গাড়ি ভাড়ার চুক্তি হবে কয়টি স্থান ঘুরবেন সেই হিসেবে। তবে দল ছোট হলে বিভিন্ন ট্যুর প্যাকেজেও ঢুকে পড়তে পারেন।

দার্জিলিংয়ে যা যা দেখতে পারবেন-
১. পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু রেলওয়ে স্টেশন ঘুম।
২. সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অপূর্ব সূর্যোদয় দেখা।
৩. খুব ভোরে ৮ হাজার ৩’শ ফুট উঁচু টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড় চূড়ায় সূর্যোদয়ের অসাধারণ দৃশ্য।
৪. পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি।
৫. ছবির মতো সুন্দর স্মৃতিসৌধ বাতাসিয়া লুপ।
৬. দার্জিলিং চিড়িয়াখানা।
৭. পাহাড়ে অভিযান শিক্ষাকেন্দ্র হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট। সর্বপ্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-রক- এর স্মৃতিস্তম্ভ।
৮. কেবল কারে ১৬ কিমিটার এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ভ্রমণ।
৯. হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে পৃথিবী খ্যাত ব্ল্যাক টি পানের অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
১০. যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ সেন্টার।
১১. প্রায় ৮’শ ফুট উঁচুতে দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম।
১২. নেপালি জাতির স্বাক্ষর বহনকারী দার্জিলিং মিউজিয়াম।
১৩. পৃথিবীর বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার জাপানিজ টেম্পল।
১৪. ব্রিটিশ আমলের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কাউন্সিল হাউস লাল কুঠির অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন খ্যাত আভা আর্ট গ্যালারি।
১৫. শতবর্ষের প্রাচীন মন্দির দিরদাহাম টেম্পল।
১৬. পাথর কেটে তৈরি রক গার্ডেন এবং গঙ্গামায়া পার্ক।
১৭. হিমালয় কন্যা কাঞ্চন-জংঘা, পানির অবিরাম ঝর্ণাধারা ভিক্টোরিয়া ফলস্ এবং সুসভ্য জাতির সংস্কৃতি।

দার্জিলিংয়ে কেনাকাটা
দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডের মার্কেটে ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে শীতের পোশাক, হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ লেদার জ্যাকেট, নেপালি শাল এবং শাড়ি, অ্যান্টিক্স ও গিফট আইটেম, লেদার সু, সানগ্লাস। প্রতারনার শংকা নেই। তবে ভ্রাম্যমাণ ফেরি থেকে শাল, শাড়ি না কেনাই ভাল। যেতে বা আসতে শিলিগুড়ির বিধান মার্কেট থেকেও কেনাকাটা করা যায়।

দার্জিলিংয়ে ভ্রমণের সময়
শীতের শুরু বা শেষের দিকে দার্জিলিং ভ্রমণের জন্য ভালো। দার্জিলিং এ পাহাড়ি ধস নামে বর্ষা মৌসুমে। শীত বা গরমে সে ঝুঁকি নেই। ঠাণ্ডার এড়াতে গরম কাপড় নেয়া জরুরি। হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে চলাফেরা করলে দালাল বা হারিয়ে যাওয়ার শংকা থাকে না।

সূত্র: সমকাল