Home » স্বচ্ছ জলের লেক মহামায়ায় কায়াকিং

স্বচ্ছ জলের লেক মহামায়ায় কায়াকিং

কর্তৃক BDHeadline

Tour-bd.com: বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ তরুণীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম। সম্প্রতি এই ধারণার প্রসার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। আসলে অ্যাডভেঞ্চার বলতে আমরা কী বুঝি এমন প্রশ্ন অনেকের মনে আসতেই পারে। এক কথায় বলা যেতে পারে, রোমাঞ্চকর দুঃসাহসিক, প্রচলিত কর্মকাণ্ডে র বাইরের কাজকেই অ্যাডভেঞ্চার বলা হয়।

অ্যাডভেঞ্চার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ট্রেকিং, ক্লাইম্বিং, প্যারাগ্লাইডিং, প্যারাসেইলিং, বাঞ্জি জাম্প, স্কুভা ড্রাইভিং, কায়াকিংসহ আরও অনেক কিছু। এরই মধ্যে কায়াকিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আমাদের দেশে। এবারের গল্প কায়াকিং ঘিরে।

৫ দিন পরেই পরীক্ষা। সারাবছর দৌড় ঝাপ করে দিন কাটলেও পরীক্ষার আগে ব্যস্ত হয়ে ওঠে আমার মন। কারণ সারা বছর কিছুই যে পড়ি না। তা সে যাই হোক। বৃহস্পতিবার দুপুরেও জানতাম না যে রাতে চট্টগ্রাম যাবো। বিকেলের দিকে সাইমুন বলল, তোমার পরীক্ষা কবে? আমি বললাম ৫ দিন পরেই। সে বলল অনেক সময় আছে হাতে। চল চট্টগ্রাম যাই।

বাকিটা ইতিহাস। আমি সাইমুন, শোভন, দেব আর রিফাতসহ ৫ জনের দল নিয়ে রওনা হই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। ভোর ভোর পৌঁছে যাই সীতাকুণ্ডে। চন্দ্রনাথ পাহাড় আর গুলিয়াখালি সী বিচ দেখে মহামায়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা।

বাসে যেতে রিফাত বলছিল, মহামায়া লেক নাকি বিশাল বড়। মানে ম্যাপে তাই দেখাচ্ছে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই ঠাকুরদীঘি বাজারে। সেখান থেকে অটো করে মহামায়া ইকো পার্ক। এন্ট্রি ফি দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। ১০ মিনিট হাঁটলেই দেখা মিলল মহামায়া লেকের। যেহেতু আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কায়াকিং তাই আগে ভাগে গিয়ে নিজেদের নামে বুকিং দিয়ে আসি।

৫ জনের মধ্যে আমরা ৪ জনই কায়াকিং করবো। দেব আগেও এসেছে এখানে। তাই সে কায়াকিং করতে আগ্রহী না। বুকিং দেওয়ার সময় বলে দেওয়া হলো এক ঘণ্টা পর আমাদের সময় আসবে। ততক্ষণ আর কী করার। বসে বসে গল্পগুজব করা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। আর সাইমুনের হাতে ক্যামেরা থাকায় সে ঘুরে ঘুরে ছবি এবং ভিডিও করছে।

মহামায়া লেক বাংলাদেশের দ্বিতীয় কৃত্রিম লেক। এর আয়তন প্রায় ১১ কিলোমিটার। মিরসরাইয়ের দূর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ১১ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে তৈরি হয়েছে এই লেক।

লেকের স্বচ্ছ পানি আর সবুজের চাদরে ঘেরা পাহাড়ের মিতালী এনে দিয়েছে অন্য রকম এক রূপ। লেকের মাঝে কোথাও কোথাও জঙ্গলে ঘেরা দ্বীপের মতো সৃষ্টি হয়েছে। এই সবুজ শ্যামল মায়াবী প্রকৃতি চোখ জুড়ায় সবার। দেশের অপরূপ এই সুন্দর প্রকৃতির মধ্যে অন্যতম একটি লেক মহামায়া।

লেকের পাড় সিমেন্টের বোল্ডার দিয়ে বাঁধাই করা। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে লেকের পাড় ধরে পানিতে নেমে যাচ্ছিলাম। এমন সময় ডাক দিল সাইমুন। আমাদের কায়াকিংয়ের ডাক পড়েছে। দেবকে ব্যাগপত্রের পাহারায় বসিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম কায়াকিংয়ের কাছেই।

নিজেদের নামের সম্পূর্ণ এন্ট্রি আর মোবাইল নাম্বার দিয়ে লাইফ জ্যাকেট পরে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। এন্ট্রি করার সময় একজন জিজ্ঞাসা করলাম, আপা, এর আগেও কি এখানে কায়াকিং করেছেন? বুঝলাম না কেন এমন প্রশ্ন করল। হয়ত চেনা চেনা লেগেছে তাই করেছে। আমি এর আগে কখনো কায়াকিং করিনি। তবে পদ্মা পাড়ের মেয়ে হওয়ার সুবাদে নৌকা আর ভেলা চালানোয় বেশ ভালো অভিজ্ঞতা আছে।

আমি আর রিফাত এক কায়াকে উঠি। অন্যদিকে সাইমুন আর শোভন আরেক কায়াকে ওঠে। লেকে উঠে মাথায় ভূত চাপাল আমরা সাইমুনদের কায়াকের সাথে পাল্লা দিবো। যদিও আমরা চারজনই ভালো সাঁতার জানি। তাই খুব বেশি ভয়ডর ছিল না আমাদের। লেকের এ-মাথা ও-মাথা করে ফেলছি। যত ভিতরের দিকে যাচ্ছি লেকের পানি যেন আরও বেশি স্বচ্ছ এবং টলটলে হয়ে যাচ্ছে।

কোথাও কোথাও মাছের টোপ ফেলে বসে আছে অনেকেই। ৫০০ টাকা চুক্তিতে সারাদিন মাছ ধরা যায়। পুরো লেকে স্বচ্ছ পানির আবহ মুগ্ধ করে আমাকে। অপূর্ব এই লেকের স্বচ্ছ পানিতে ভেসে ওঠে নিজের প্রতিচ্ছবি। পড়ন্ত বিকেলে অনিন্দ্য হয়ে ওঠে লেকের অন্য আরেক রূপ। নিবিড় হয়ে ধরা দেয় দূরের ঐ সবুজ পাহাড়।

ঘণ্টা চুক্তিতে কায়াকিং করি। ঘণ্টা প্রতি খরচ ৩০০ টাকা। ছাত্রদের জন্য তা আরেকটু কম। মাত্র ২০০ টাকা। কায়াকিংয়ের এই রোমঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘুরে বেড়াই ১১ কিলোমিটার। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি বলা যায় এই মহামায়া লেককে। বর্তমানে কায়াকিং জনপ্রিয় হওয়ায় প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীর ভিড় বাড়ছে। কায়াকিং ছাড়াও মহামায়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে, কিন্তু কায়াকিং না করলেও কোথাও যেন আফসোসটা থেকেই যায়।

কায়াকিং করতে করতে কখন যে এক ঘণ্টা শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। কূলে এসে কায়াক থেকে নামতেই বুঝতে পারলাম সকালের পর থেকে তেমন কিছু পড়েনি পেটে। লেকের টলটলে পানিতে গোসল সেরে বেরিয়ে পড়ি মহামায়া লেক থেকে।

যেভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে চট্টগ্রাম গামী বাসে করে যেতে পারেন মিরসরাইয়ের ঠাকুরদীঘি বাজারে। ভাড়া নন এসি ৪২০ থেকে ৪৮০ টাকার মধ্যে।
ঠাকুরদীঘি থেকে সিএনজি করে চলে যাবেন মহামায়া ইকো পার্কের মেইন গেটে। এই ইকো পার্কের ভিতরে মহামায়া লেক। ভাড়া জনপ্রতি ১৫ টাকা।

কায়াকিং খরচ
লেকে কায়াকিং করতে চাইলে ১০ টাকা এন্ট্রি ফি দিয়ে ভিতরে ঢুকে কায়াকিং এর জন্য বুকিং দিতে হবে। প্রতি ঘণ্টা কায়াকিং ৩০০ টাকা। ছাত্রদের জন্য ২০০ টাকা।

সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫.৩০ মিনিট পর্যন্ত কায়াকিং করা যায়। এছাড়া ইঞ্জিন চালিত বোটে করে ঘুরে বেড়ানো যায়। ৮-১০ জন ধারণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ এই ইঞ্জিন চালিত বোটগুলো ঘুরে দেখাবে পুরো লেকসহ ঝর্ণা। খরচ ৮০০-১০০০ টাকার মধ্যে।

খাওয়া দাওয়া
পার্কে খাওয়া দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ঠাকুরদীঘির বাজার গিয়ে খেতে পারবেন।

থাকার ব্যবস্থা
মিরসরাইয়ে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। সীতাকুণ্ডে সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে রাত্রি যাপন করার জন্য।

সম্পর্কিত পোস্ট