সৈয়দ জামিল আহমেদের যে কথায় বদলে যাবে আপনার জীবন

48

‘আমরা যদি বলি, ‘এই মৃত্যুচিহ্নিত পৃথিবীতে জীবনের অপর নাম শিল্প।’ অনুরূপভাবে সৈয়দ জামিল আহমেদের জীবনের অপর নাম নাট্য। নিরঙ্কুশভাবেই নাট্য। সেই নাট্য মানে কী আপনার জীবনে? কিভাবে আপনি হয়ে উঠলেন?’

হয়ে ওঠা যদি বলি—এখান থেকে পেছনে তাকান—সেটা সবসময়ই রি-কন্সট্রাকশন। সেটা আমি জানি না আমাকে আসলে কীভাবে প্রভাবিত করেছে। আমি বলতে পারি কিছু কথা, যেগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে এবং সবকিছু বলার আগে আমি কয়েকটি বিষয়ে কথা বলব। এরপর আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো, যদি উত্তর না খুঁজে পান আমাকে মনে করিয়ে দেবেন।

আমি যখন ক্লাসে পড়াই তখন আমি মনে করি ‘পড়ানো’র সব থেকে ভালো পদ্ধতি হলো প্রশ্ন উত্থাপন করা। আমি এখানে বিরোধীপক্ষ হিসেবে আসিনি। আমি একেবারে মন খুলে আমার যা জানা, আমার যা বোঝা, যা কিছু আমি যেভাবে বুঝি, এই মুহূর্তে সেটাই আমি আপনাদের কাছে বলতে চাই। এবং সেটা বলতে চাই সংলাপ রচনার মাধ্যমে। আজকের এই আলোচনায় আমরা বুঝতে চাচ্ছি বাংলাদেশের থিয়েটার, বাংলাদেশের নাট্য। এটা যদি আমাদের মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে এবং আমি আমার ধারণা উপস্থাপন করি এবং আপনি আপনার ধারণা উপস্থাপন করেন তাহলে আমরা আলোচনা নিয়ে একটি স্থানে পৌঁছাতে পারবো। আমি আপনাদের শেখাতে আসিনি। আমি আপনাদের বোঝাতে আসিনি। আমি আপনাদের জ্ঞান দিতে আসিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোতে আমরা যে দেখি—একটি আলোকবর্তিকা আছে এবং মনে করা হয় যে, জ্ঞান হচ্ছে আলো বিতরণ করা এবং শিক্ষক হচ্ছেন যিনি আলো ছড়িয়ে দেন। তবে এই ধারণার কাছাকাছি গিয়ে আমি মনে করি আমরা সবাই জ্ঞানী। আমরা সবাই বুঝি। ব্যাপারটা এমন যে, আমরা একে অপরের বোঝাপড়া থেকে সমৃদ্ধ হওয়া। কেউ কাউকে জ্ঞান দেয়া না। আমি বলছি না আমি যেটা চিন্তা করি সেটা আপনি মানুন। কিন্তু চলুন আমাদের বোঝাপড়াকে আলোচনার মাধ্যমে তৃতীয় একটি অবস্থানে নিয়ে যাই। আমি মূলত সংলাপে আগ্রহী।

দ্বিতীয়ত, আপনাদের প্রশ্নের একটি উত্তর পাবেন। যদি আমি এই প্রসঙ্গ আনি। আমি সারাজীবন মনে করেছি অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করেছি বিশ্লেষণী ভাবনা এবং অনুশীলন দুটো একে অপরের সাথে না মিললে যদি ঋদ্ধ না হয় তাহলে কাজ হয় না। আমি যদি দিনরাত কাজ করে যাই কিন্তু চিন্তা না করি, বিশ্লেষণ না করি তাহলে সেটাকে কাজ বলে না। আমি প্রত্যেকটি ব্যাপারকে বিশ্লেষণ করতে পছন্দ করি, চিন্তা করতে পছন্দ করি। এবং পরবর্তী কাজে আমি এটাকে বদলাতে চেষ্টা করি।

আমরা আজ প্রস্তুতি নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা করতে বসেছি। সুতরাং পিছু হটার কিছু নাই। আশির দশকে আমি প্রথম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলাম তার আগে যখন আমি ঢাকায় কাজ করা শুরু করেছি। আমি ফার্স্ট ইয়ার থেকে ইংরেজি বিভাগে পড়েছি, সে সময় আমার কাছে খুব বিরক্ত লাগতো যদি কেউ নাটকের ব্যাখ্যা করতে তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা শুরু করেন, সুতরাং আমি বুঝতে পারি আমি যদি তাত্ত্বিকভাবে কথা বলতে থাকি এটা নিয়ে অনেকের অনীহা থাকবে হয়তো।

যা হোক, পরবর্তীকালে আমি যখন দেশের বাইরে পড়তে যাই, পিএইচডি করি এবং নাটক নিয়ে ফিল্ডওয়ার্ক করি তখন আমি উপলব্ধি করা শুরু করি যে, মানুষ সবই বোঝে। একেক জনের উপলব্ধির স্তর ভিন্ন, প্রকাশের স্তর ভিন্ন, কিন্তু কোনো বোঝা গুরুত্বহীন নয়। সুতরাং আমার স্তর থেকে আমি আমার মতো করে নাটক বুঝেছি, এবং এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থ কথা হচ্ছে, আমরা সবাই বুঝি এবং জানি। কিন্তু কীভাবে আমরা জানি যে আমরা জানি? আপনি নাট্য বুঝতে যাচ্ছেন—তো নাট্যকে যদি মনে করেন পূর্ব নির্ধারিত সত্য বা সত্তা যেটাকে আপনার বোঝা প্রয়োজন, তাহলে আপনার সাথে আমার মতবিরোধ হবে। আমি মনে করি প্রত্যেকটি ব্যাপারই নিয়ত পরিবর্তনশীল। মানুষ তার কথাবার্তার ভেতরে আলাপ আলোচনার ভেতরে, নতুনভাবে দেখার ভেতরে নিয়ত পরিবর্তনশীল। আমার কাছে চিরস্থায়ী সত্য বলে কিছু নেই। কোনো পরম সত্য আমি মানি না। এখানে আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি চূড়ান্তভাবে নিয়ম কখনো মানতে পারি না। আমি নিয়ম ভাঙতে চাই। নিয়ম ভাঙার ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নিয়মটা আসলে কী। নিয়ম না বুঝলে তা ভাঙাটা তো সম্ভব নয়, কাজেই আমার কাছে পরম সত্য বলে কিছু নেই। আমার কাছে পুরোটাই বিষয়, প্রক্রিয়া। তবে আমি আপনাকে জ্ঞান দিচ্ছি না আবার বোঝাতেও চাচ্ছি না। ধরুন, আমি রবীন্দ্রনাথ বলতে কী বুঝি সেটা আমি আপনাকে বোঝাতে চাচ্ছি না, বলছিও না আপনি বুঝুন।

আমি প্রথমে এগুলো বললাম কারণ এই কথাগুলো আমাকে বুঝতে সাহায্য করবে। দ্বন্দ্বের জায়গাগুলো কম হবে। বলে রাখা ভালো, আমি মনে করি আমি একজন মানুষ, আমি একজন শিল্পী, আমি একজন সৈনিক না যে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে মানুষ মারতে পারবো। বন্দুক উন্নত করে আরো আধুনিকভাবে কিভাবে মানুষ মারা যায় সেটার গবেষণা আমি করি না। আমি দারুণভাবে জীবন নিয়ে আক্রান্ত। একবার সেলিম আল দীন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলেন, ‘তুই কথা বলতে গিয়ে এতো উত্তেজিত হয়ে যাস কেনো?’ আমি বলেছিলাম, আমি জীবনের সাথে এভাবে সবসময় যুক্ত হই। আমি কখনো ভান করে যুক্ত হই না। আপনাদের কথা আমাকে নাড়া দেয়, আমি যুক্ত হই, আমি উত্তেজিত হয়ে যাই, এখনো হচ্ছি—কারণ আমরা যখন কথা বলছি তখন উড়িষ্যায় সাইক্লোন আঘাত হেনেছে। এবং পৃথিবীতে অনেক জায়গায় হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তারপরো আমরা বেঁচে থাকি, কথা বলি, ভাত খাই। কাজেই, আমি কোনো বোদ্ধা ব্যক্তি নই যে, ভান করতে পারি।

যা হোক এখন মূল কথায় আসি, থিয়েটার কী বা নাট্য কী?

আমি যেটা বুঝি সেটা সবসময়ই সোজাসুজি বলি। কিছুদিন আগে একটি টেলিভিশনের টক শোতে বলেছিলাম—সেখানে আমরা নাটক এবং উপন্যাসের পার্থক্য করছিলাম—উপন্যাস হচ্ছে আপনি একটি বই খুলে কিছু শব্দ পড়লেন, আর যখন ওই কথাগুলো বলেন তখন আর সেসব উপন্যাস নয়। কাজেই আপনারা যদি সংজ্ঞা না বুঝে বলতে থাকেন যে, আমি উপন্যাস দেখছিলাম, তখন আমার মনে হয় আপনার সাথে আগে প্রকার নিয়ে কথা বলা উচিত। আমি ১৯৭৫-৭৬ সাল থেকে থিয়েটার করে এই পর্যন্ত নাট্য সম্পর্কে আমার যে ধারণা সেটা হলো, তিনটি বাক্য—এক. কেউ কিছু করে, দুই. কেউ কিছু দেখে, তিন. কিছু পড়া হয়। সব মিলিয়ে একটি ত্রিমাত্রিক আয়তন। একজন কিছু করে বা একাধিক মানুষ কিছু করে, এক বা একাধিক মানুষ কিছু পড়ে আর সেটা এক বা একাধিক মানুষ কিছু দেখে। এবং এগুলো ঘটে একটি ত্রিমাত্রিক আয়তনে। এই ত্রিমাত্রিক স্থান যে কোনো স্থানেই হতে পারে। আর এর সাথে আমি যেটা যোগ করি, সেটা হলো পারফর্মেন্সের বেসিক ক্যাটাগরি এবং ফিকশোনাল কিছু থাকতে হবে। যেমন কেউ কিছু করে এবং সেটাকে রূপান্তরিত করতে পারে একটি ভুবনে, যেটা এক বা একাধিক মানুষ দেখছে তবেই সেটা থিয়েটার। এবার সেই থিয়েটার বলতে গেলে সেখানে দ্বন্দ্ব যে থাকতেই হবে সেটা অপরিহার্য নয়। এটা অনেক পুরনো কথা যে, দ্বন্দ্ব থাকতেই হবে যেটা অ্যারিস্টটলের পয়েটিক্স থেকে হেগেল হয়ে বিংশ শতকে অনেক আলোচিত হয়ে বিংশ শতকের মাঝামাঝি এসে প্রত্যাখ্যিত হয়ে গেছে। এটা আমাদের লোকনাট্য স্বীকার করে না, নাট্যশাস্ত্র স্বীকার করে না। নাটকে দ্বন্দ্ব অপরিহার্য নয়, অপরিহার্য হচ্ছে কিছু ঘটা। কিছু ঘটতে হবে। যেটাতে আপনার আগ্রহ থাকে, আপনি যেন দেখেন কিছু একটা ঘটছে। আমার কাছে থিয়েটারের বেসিক ব্যাপার এটা। যে কোনো কিছু নিয়ে এটা হতে পারে, টেক্সট সহ হতে পারে টেক্সট ছাড়াও হতে পারে। তবে একজন জীবন্ত মানুষ, এক বা একাধিক জীবন্ত মানুষের সামনে ত্রিমাত্রিক আয়তনে কিছু একটা যখন করে, আর সেই কিছু করাটা যখন একটি ভুবনে পরিণত হয় তখন আমরা তাকে থিয়েটার বলি।

এটা আমার কাছে থিয়েটার, এবার বলি থিয়েটার বিষয়ে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ—থিয়েটার কখন শিল্প হয়, আমি ক্লাসে তিনটা চারটা ব্যাপার বলি এটা নিয়ে। প্রথম কথা হলো, ইয়ু প্লে উইথ ফর্ম। আমরা মনে করি থিয়েটার করতে গেলে একটি প্রচলিত প্রথা মানতে হয়, আমাদের ধারণা থিয়েটারের একটি প্রচলিত ফর্ম বা রূপ রয়েছে—থিয়েটার করতে গেলে চরিত্র থাকতে হবে, একজনকে কথা বলতে হয় যেটাকে আমরা সংলাপ বলি, এবং একটি গল্প থাকে এবং ওই গল্পটির মাধ্যমে একটি দ্বন্দ্বের জায়গায় পৌঁছাতে হয়। এরকমভাবে একটি ফর্ম আছে বলে আমরা মনে করি। কিন্তু আপনি যখন এই ফর্মকে নিয়ে খেলতে থাকেন, মানে যে প্রচলিত ফর্ম আছে সেটা থেকে বের হয়ে যেতে চেষ্টা করেন বা সেটাকে ভেঙে ফেলতে চেষ্টা করেন তখনই আপনি নতুন কিছু তৈরি করতে পারেন। থিয়েটারের ক্ষেত্রে ‘ক্রীড়াময়তা’ শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমেই নতুন কিছু প্রবেশ করে।

পাকিস্তানের একজন উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী আমাকে কথাটা বলেছিলেন, আমি তাকে বলেছিলাম, দেখুন আপনারা যে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত করেন এটা আমার কাছে খুবই বোরিং মনে হয়, উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শোনার বেশীরভাগ সময়ে আমার ঝিমুনি আসে। তিনি আমাকে বলেছিলেন কথাটা ঠিক, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ সেটা প্রচলিত ফর্মের মধ্যেই সাধারণভাবে থাকে। কিন্তু সেটাকে যদি ভাঙতে চেষ্টা করো, মানে যদি ফর্মটিকে একটি বিল্ডিং হিসেবে চিন্তা করা হয় এবং সেটাকে যদি হেলানো হয় আবার সেটা হেলতে হেলতে ভেঙে যাবে না, মানে তুমি হেলানোর সর্বোচ্চ কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারো যেটা না ভেঙেও অটুট থাকবে তখন তোমার আর ঝিমুনি আসবে না।

তিনি আমাকে বলেছিলেন এক্ষেত্রে দুইটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ—তাল এবং রাগ। এই তাল এবং রাগের উপরেই এর কাঠামো। এই তাল এবং রাগকে ঠিক রেখে আমি যদি যে কোনো জায়গায় যাই, প্রচলিতভাবে যেভাবে গাওয়া হচ্ছে সেটা থেকে বেরিয়ে গিয়ে এই দুটিকে অক্ষুণ্ণ রেখে আমি যদি নতুন কিছু তৈরি করি তখন আই আম প্লেইং উইথ ফর্ম। তো থিয়েটারের ক্ষেত্রে প্রথমত এই প্লে উইথ ফর্ম আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা থাকায় সেই কাজটি শিল্পকর্মের দিকে যেতে থাকে। আমি মনে করি না থিয়েটারের প্রচলিত কোনো নিয়ম আছে যেটাকে মেনেই শুধুমাত্র থিয়েটার করা যায়।

দ্বিতীয়ত, থিয়েটার শিল্পকর্ম হয়ে গেলে যে ব্যপারটি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো নন্দনতাত্ত্বিকভাবে সফল হতে হবে। নন্দনতত্ত্ব বলতে আমরা আজকাল যা বুঝি, সেটা হেগেল থেকে ইউরোপ হয়ে আমাদের কাছে এসেছে। আমরা নন্দনতত্ত্ব বলতে বুঝি প্রথমত সুন্দরকে আর সুন্দরের ধারণা, বা কাঠামো যা আমাদের কাছে অনেক আগে থেকেই আছে, কাজেই আমরা সেই ধারণা মেনে নন্দনতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু আমার কাছে, মানে আমি ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করি ভিন্নভাবে। নন্দনতত্ত্বে তাত্ত্বিকভাবে কোনো কিছু সফল হতে গেলে আমার মতে সেটার ক্ষমতা থাকতে হবে দর্শক, পাঠক শ্রোতা যা-ই বলেন, তাদেরকে নাড়া দিতে হবে। দর্শক নাটক দেখলো, দেখে শেষ করে চুপ করে উঠে চলে গেলো তাহলে এর মানে হলো ওই নাটক নন্দনতত্ত্বিক স্থান থেকে সফল নয়। আমি যা দেখলাম, সেটা আমাকে কোনো না কোনোভাবে ধাক্কা দিতে হবে, নাড়া দিতে হবে কিংবা দাগ কাটতে হবে। এই নাড়ানো ভালো না লাগাও হতে পারে। আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি নাটক কেমন লেগেছে, বলে, ভালো লেগেছে। কিন্তু এই ভালো লাগা নন্দনতত্ত্বের ব্যাপার নয়, এটা নাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপার। নাট্যশাস্ত্রে নাটকের রসের যে কয়টি প্রকার আছে সেগুলোর মধ্যে আপনি যদি বীভৎস রসের নাটক দেখেন তাহলে এটা আপনার কাছে কখনই ভালো লাগবে না। কিন্তু আপনাকে নাড়া দিতে বাধ্য। সুতরাং খারাপ লেগেও যদি আপনাকে নাড়া দেয় তাহলে সে নাটক নন্দনতাত্ত্বিক স্থান থেকে আমার মতে সফল, মানে একটি শিল্প হয়ে ওঠার দ্বিতীয় শর্ত পূরণ করলো। আবার শুধুমাত্র ভালো লেগেও আপনাকে যদি তা নাড়া না দেয়, ধাক্কা না দেয়, আপনার মনে ছাপ না ফেলে নন্দনতাত্ত্বিক স্থান থেকে সেটা সফল নয়।

আরেকটি কথা হচ্ছে, জীবন কখনই শিল্প নয়, আবার শিল্প কখনই জীবন নয়। রূপান্তর একটি হতেই হবে। আর এই রূপায়ন বা প্রতিরূপায়নের নতুন ভাষা তারাই খোঁজেন যারা প্রথা ভাঙতে চান। আর এর জন্য কী করতে হবে? প্রশ্ন করতে হবে।

আমি যখন কোনো কাজ করতে বসি তখন নিয়মের ধার ধারি না। আমি বই-পুস্তক খুলে বসি না যে কোনো নিয়ম মেনে লিখতে হবে। আমি যখন নির্দেশনা বা পরিচালনার জায়গাটায় কাজ করি তখন আমি বুঝতে চেষ্টা করি টেক্সটের পারফর্মেন্স—যখন একটা কিছু লিখিত আছে সেটাকে রূপ দিতে হবে সেটা আমি বুঝতে চেষ্টা করি। সেটা একটি কবিতা হতে পারে, গল্প হতে পারে, উপন্যাস হতে পারে। আপনি যদি একটি উপন্যাস বাসায় বসে পড়েন, তাহলে সেটা পড়া। বইয়ে কিছু শব্দ লেখা আছে আর সেগুলো পড়ার মাধ্যমে আপনার মধ্যে কিছু একটা তৈরি হয়, এই ব্যপারটা পড়া। কিন্তু থিয়েটার আপনারা যখন দেখছেন সেখানে জীবন্ত মানুষ কিছু বলছে। এখন কী এসে যায়, যদি কোনো চরিত্র না থাকে? চরিত্র ছাড়া কি থিয়েটার হতে পারে না? গল্প থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। আপনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে কিছু যেন ঘটে, আমার কাছে চরিত্র কিংবা গল্প প্রধান নয়, আমার কাছে প্রধান হলো কিছু ঘটতে হবে। এই কিছু ঘটতে গেলে কিছু করা লাগে।

এবার আসি আরেকটি প্রসঙ্গে—অভিনয় কী? অভিনয় কখন হয়, কখন হয় না?—যখন ভান করি তখন হয় না, যখন ভান করি না তখন হয়। কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তী বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘অভিনয়’ শব্দটিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেটা হলো অভি+নী+ক্রিয়ামূল= অভিনয়, যার অভি মানে হলো নেওয়া, বা একজন থেকে আরেক জনের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর ‘নী’ ক্রিয়ামূলের অর্থ দুটি হতে পারে, একটি হচ্ছে নয়, এছাড়া আরো আছে ‘করা’ ‘হওয়া’ ‘লও’ ইত্যাদি। সুতরাং অভিনয় মানে, কিছু নিয়ে যাওয়া, হওয়া। এখন তাহলে কী নিয়ে যাওয়া হয়? নাট্যশাস্ত্র বলছে, একটি যে টেক্সট আছে আর ওই টেক্সটের যে অর্থ, টেক্সট যা বলতে চায় সেটা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই হচ্ছে অভিনয়। আপনি পৌঁছে দিতে পারেন চরিত্র হয়ে, আপনি পৌঁছে দিতে পারেন বসে বসে কথা বলে, যেভাবেই হোক আপনি যদি টেক্সটের অর্থটা দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন তাহলে অভিনয় হচ্ছে। আবার কখনো কখনো পৌঁছে না দেওয়াটাও অভিনয় হতে পারে, তখন মান্না দের ওই গানের কথায় চলে যেতে হয়, “তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন/ সবই তোমার অভিনয়/সত্যি কোনো কিছু নয়/আমি দুঃখ পেলেও খুশী হলাম জেনে…”

আমরা বেশীরভাগ সময়ে ‘অভিনয়’কে এই অর্থ ধরি—ভান অর্থে। কিন্তু থিয়েটারের ‘অভিনয়’ মানে ভান ধরা নয়। এই জায়গাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি ভান না ধরার মাধ্যমে কোনো টেক্সটের অর্থ যদি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন তাহলে তাকে অভিনয় বলে। তবে এটা কিন্তু হতে হবে একটি কাল্পনিক ভুবনের মধ্যে। থিয়েটারের শর্ত যেটা।8

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকে অভিনয়ের মানে করেন, ধারণ করা; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শুনেছি, ডুব দেওয়া। এটা ব্যক্তিগত মত হতেই পারে। কিন্তু আমি এর সাথে একমত নই। আমি যেটা বুঝি সেটা সহজভাবে বললাম। চলবে