Home » সুন্দরবনের পট গান শুনতে কৈলাসগঞ্জে

সুন্দরবনের পট গান শুনতে কৈলাসগঞ্জে

কর্তৃক BDHeadline

সুন্দরবন আমার অনেকবারই যাওয়া হয়েছে। এখনও বাঘ এবং কিং কোবরার দেখা পাইনি বলে আরও অনেকবার মনে হয় যেতে হবে। আরেকটি ইচ্ছা ছিল সুন্দরবনের পাশ্ববর্তী কোনো গ্রামে এক রাত থাকার। নানা কারণে সেটা হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সুযোগটা চলেই আসল একদিন।

খুলনা এসেছিলাম অফিসের কাজে। অন্য একজন সহকর্মী প্রস্তাব দিলেন কৈলাসগঞ্জে কিছুদিন আগে তৈরী হওয়া শর্মিলা দির কটেজে থেকে আসার জন্য। সাথে সাথেই লুফে নিলাম প্রস্তাবটা। মোংলায় আমাদের আরও কিছু কাজ ছিল, সেগুলো শেষ করে মোংলা ঘাটে এসে রওনা দিলাম কৈলাসগঞ্জের দিকে।

পশুর নদী পার হয়ে ওপারে বানিয়াশান্তা বাজারের ঘাটে নামলাম। ইঞ্চিনচালিত নৌকা কাল আবার আমাদেরকে নিতে আসবে জানিয়ে চলে গেল। ঘাটেই অপেক্ষা করছিল শর্মিলাদির পাঠানো ইজিবাইক। ঘাট থেকে রওনা দিয়ে কৈলাসগঞ্জে যেতে আমাদের মোটামুটি এক ঘণ্টা লাগলো।

নদীর এপারটা খুলনার দাকোপ উপজেলার মধ্যে পড়ে। বেশ ভালোই লাগছিল গ্রামের রাস্তায় ইজিবাইকে করে যেতে। তবে ভালোই শীত পড়ছে, অবশ্য শীতের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি আমি। গ্রামে পৌঁছে যখন ইজিবাইক থেকে নামলাম, নদীর ওপারে সুন্দরবন দেখা যাচ্ছে। বাঁধটাই রাস্তা, সেখান থেকে ছোট একটা রাস্তা নেমে গেছে শর্মিলাদির বাড়ির দিকে। নিজের বাড়ির পাশেই চমৎকার কটেজটি করেছেন উনি।

কটেজে ঢোকার আগেই একটা পুকুর পড়ল। সে পুকুরের মাঝে ছোট্ট একটা বসার জায়গা তৈরী করা হয়েছে। দেখেই মন ভালো হয়ে গেল আমাদের। সারাদিন তো এই এখানে বসেই কাটিয়ে দেয়া যায়। আগের রুমে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম, তাই পুকুর বাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে কটেজে যেয়ে ঢুকলাম।

পুরো কটেজের বেড়ার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে পাটি। ভেতরে দুটো রুম আছে। এক রুমে ঢুকে ব্যাগ রেখে বাথরুমে ঢুকে অবাক হয়ে গেলাম। হাই কমোড আছে, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। একটু ফ্রেশ হয়ে যখন বের হলাম দেখি ডাইনিং রুমে আমাদের নাস্তার আয়োজন করা হয়েছে। সব এখানকার স্থানীয় পিঠা, আরাম করে খেয়ে দেয়ে জানতে পারলাম উঠোনেই আয়োজন করা হয়েছে পট সঙ্গীতের, সন্ধ্যা নামার পর আমরা যাতে সেখানেই বসে পড়ি।

সন্ধ্যার পর আমরা আসলাম উঠোনে। বেশ বড়সড়ো আয়োজন করা হয়েছে। সুন্দরবনের প্রাণভোমরা রাজকীয় প্রাণী বাঘ। এ বাঘ যদি না বাঁচে তাহলে সুন্দরবনও বাঁচবে না। পট সঙ্গীতের কাহিনী গড়ে উঠেছে বাঘের সাথে মানুষের সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে। বাঘকে বাঁচাতে কী কী করতে হবে সেটাও বলে দেয়া হয়েছে।

লোকালয়ে বাঘ আসার ঘটনা এখন বিরল। আসলে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। যে কয়টা বাঘ আছে তারা অনেক ভেতরে চলে গেছে। আমার মনে আছে প্রথম যেদিন আমি সুন্দরবন যাই সেদিনই একটি আধ-খাওয়া গরু দেখেছিলাম। রাতের বেলা বাঘ নদী পার হয়ে এসে বাড়িতে ঢুকে এ গরুটার অর্ধেক খেয়ে ফেলেছিল।

সুন্দরবনে সবচেয়ে বড় আতংক রাজকীয় এ প্রাণীটি। বাঘ টিকে আছে বলেই হয়তো বনটি এখনও টিকে আছে। অবশ্য বনের উপর অত্যাচার কম হচ্ছে না। তবে অন্য বনের চেয়ে সুন্দরবন একদিক সম্পূর্ণ আলাদা, বনের মধ্যে অন্তত কেউ বসবাস করে না। ফলে বনের জায়গা দখলমুক্তই আছে।

প্রচণ্ড শীতের মধ্যে চলছে এ আয়োজন। পেছনে দুজন শিল্পী একটা ব্যানারের মতো ধরে রাখে। গানের সাথে সেটা পরিবর্তন করতে থাকে। স্থানীয় পরিবারগুলোই এই পুরো অনুষ্ঠানের শিল্পী। ভালোই ভিড় জমে গেল সেখানে। শুনতে খুব ভালো লাগছিলো। কিন্তু এ ঠাণ্ডায় সবাইকে কষ্ট দিতে আর ইচ্ছে হচ্ছিল না।

অনুষ্ঠান শেষ হতেই জানতে পারলাম টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। নিজেদের পুকুরের মাছের তরকারী আর হাসের মাংস ভুনা দেখে খাবারের সুগন্ধে টের পেলাম ভালোই ক্ষুধা লেগেছে। সব্জি ও অন্যান্য তরকারিও এসেছে নিজেদের গ্রামের খামারগুলো থেকে। স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিমাণেই খেয়ে ফেললাম।

রাতে এ ধরনের জায়গায় শীত কেমন পড়ে আমার পূর্ব ধারণা ছিল। ভেবেছিলাম জ্যাকেট গায়ে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়বো। শোবার সময় দেখলাম পরিস্কার পরিচ্ছন্ন খাটে ভালো কম্বল রাখা আছে একটা। ওটা গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে কোনো সমস্যাই হয়নি। সকালে খুব ভোরে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙল।

বাইরে পুকুরের মধ্যে করা গোল ঘরে বসে অনেকক্ষণ সকালের সৌন্দর্য দেখলাম। বাড়ীর সামনের বাঁধে উঠেই ওপারে সুন্দরবন দেখতে পেলাম। চাঁদপাই রেঞ্জের সুন্দরবনের এই অংশ ঢাংমারি নামে পরিচিত। পুরো খালটিই সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিলুপ্ত হতে চলা ইরাবতী ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্র এটি।

কিছুক্ষণ নদীর পাড়ে বসে থাকলেই দেখা মেলে এদের। স্থানীয়রা শুশুক বলে এদের। ধৈর্য ধরে বসে রইলাম আমরা। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম নদীতে তাদের মুহূর্তের জন্য লাফ দিয়ে উঠে পরক্ষণে হারিয়ে যাওয়া। ছোট নৌকা নিয়ে খালের মধ্যে ঘুরে আসার প্রস্তাব দিল শর্মিলাদির স্বামী।

হাতে সময় না থাকার কারণে এ লোভনীয় প্রস্তাবটায় রাজি হতে পারলাম না। সকালে নাস্তার সাধারণ আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু পরিবেশের কারণেই হয়তো সবকিছু অনেক বেশি ভালো লেগেছে। আটার রুটি, স্থানীয় সতেজ সব্জি ভাজি, হাঁসের ডিম ভাজি, ডাল দিয়ে পেটপুরে খেয়ে আমরা মোংলার পথ ধরলাম।

কমিউনিটি ট্যুরিজমে বাংলাদেশ প্রতিবেশি দেশগুলোর থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে। এত চমৎকার আয়োজন দিয়ে মন জয় করলেও সুন্দরবনে এ কমিউনিটি ট্যুরিজম বেশিদূর এগুতে পারবে কিনা আমার বেশ সন্দেহ আছে। এর বড় কারণ মার্কেটিং। এ লোকগুলোর আন্তরিকতার অভাব নেই। সার্ভিসও টাকার তুলনায় অনেক ভালো।

কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতার বাজারে এরা কীভাবে টিকে থাকবে বলা মুশকিল। গ্রামে নেটওয়ার্ক আছে সত্যি তবে তা অনেক দূর্বল। ফেসবুকে প্রমোশনের কথাও তারা কোনোদিন শোনেনি। অন্তত একটা পেইজ খুলে রাখার উপদেশ দিয়ে আসলাম। পুরো ট্রিপের খরচও তেমন বেশি কিছু না।

কটেজের রুমগুলোর ভাড়া ১,০০০ টাকা করে। প্রতি রুমে ৪ জন করে থাকা যায় সহজেই। খাওয়া দাওয়া প্রতিবেলায় ২০০ টাকা করে ধরেছে। আর নাস্তার জন্য ১০০ টাকা। মোংলা নদী পার হতে লাইনের ট্রলারে আসলে জনপ্রতি ২০ টাকায় আসা যায়। ইজি বাইক আসা যাওয়া মিলিয়ে নিয়েছে ৪০০ টাকা। আর পট সঙ্গীত আয়োজনের জন্য আমরা ২,০০০ টাকা সম্মানী দিয়েছি।

আপনারা কেউ যদি সুন্দরবনের এই কমিউনিটিতে থাকতে চান তবে যোগাযোগ করতে পারেন নিচের ঠিকানায়

সুন্দরবনের শর্মিলা ইকো কটেজ, কৈলাসগঞ্জ, দাকোপ, খুলনা। দেশের যেকোনো জায়গা থেকে মোংলা সেখান থেকে বানিয়া শান্তা বাজারে নদীপথে পৌঁছাবেন। বাজার থেকে ইজিবাইক বা মোটর বাইকে যেতে পারবেন কটেজে।

সম্পর্কিত পোস্ট