সাইকোথেরাপির আদ্যপান্ত জানুন

174

সাইকোথেরাপি বা টকিং কিউর মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাপক উপকারী ফল বয়ে আনে। এ থেরাপি দ্বারা ব্যক্তির আবেগগত যন্ত্রণা, মানসিক ডিসঅর্ডার এবং প্রাত্যহিক জীবনের স্ট্রেসের চিকিৎসা করা হয়। লিখেছেন ডা: মৌসুমী রিদওয়ান

এটা এমন এক ধরনের থেরাপিউটিক পদ্ধতি যার মাধ্যমে ব্যক্তি পরিপূর্ণরূপে বুঝতে পারে তার সামর্থ্য, সমস্যা, প্রেরণা এবং উদ্বিগ্নতা। ডাক্তার-রোগীর পারস্পরিক বিশ্বস্ত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এই থেরাপিউটিক প্রোসেস এগিয়ে চলে। এটি কয়েক মাস বা বছর ধরে চলতে পারে। এটা অত্যন্ত পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যা অন্য আরেক মানুষের সাথে গড়ে ওঠে- একথা বলেছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ক্যারোলিন গারেলন্ড, লন্ডনের টাভিস্টক ক্লিনিকের যিনি একজন চিকিৎসক। থেরাপিস্ট তার রোগীকে অন্যদের চেয়ে বেশি জানেন বোঝেন।

সাইকোথেরাপিস্ট কে?
সাধারণ একজন সাইকোথেরাপিস্টের মানসিক স্বাস্থ্য পেশায় অ্যাডভান্স কোয়ালিফিকেশন থাকতে হয়। এই মানসিক স্বাস্থ্য পেশায় যোগ্যতা মানসিক স্বাস্থ্যের যেকোনো বিভাগ থেকে হতে পারে। যেমন- সাইকিয়াট্রি, সাইকোলজি, সাইকিয়াট্রিক পেশেন্ট নার্সিং।
সাইকোথেরাপিতে কী ঘটে?

সাইকোথেরাপির সেশন একই জায়গায় এবং একই সময় হয়ে থাকে। সাধারণত প্রতি সপ্তাহে অথবা প্রতি পক্ষকালে এবং এই সেশনে থেরাপিস্ট ও রোগীর মধ্যে যেসব কথাবার্তা হয় তা সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ মিনিট সময়ের জন্য হয়ে থাকে।
ইনডিভিউজুয়াল থেরাপিতে রোগী এবং থেরাপিস্ট সবসময় একটি চেয়ারে বসেন। গ্রুপ থেরাপি হয় সাধারণত তিনজন বা তার বেশি ক্লায়েন্ট নিয়ে এবং এতে বিশেষ বিশেষ রকমের সমস্যা নিয়ে কথাবার্তা বলা হয়। কেউ কেউ আবার থেরাপিউটিক টেকনিকের কম্বিনেশন ঘটায়। যেমন- ইনডিভিউজুয়াল এবং ম্যারিটাল থেরাপি (যেখানে দম্পতিরা একজন বা দুইজন থেরাপিস্টের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করে)। টেকনিক যাই হোক না কেন, সাইকোথেরাপি কোনো ম্যাজিক নয় বরং এর মাধ্যমে আরোগ্য হওয়ার ক্ষমতা একেক ব্যক্তির একেক রকম। এক সময় রোগী এ ধারণায় উন্নীত হয় যে তারা তাদের কঠিন পরিস্থিতি, অনুভূতি, চিন্তা-ভাবনা এবং আচার-আচরণের ওপর আগের চেয়ে বেশি মাস্টারি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।

কাউন্সেলিং অথবা সাইকোথেরাপি
এ দু’টির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে গরম গরম যুক্তিতর্কের ইস্যু রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ সাইকোলজি সোসাইটি কাউন্সেলিং বলতে বোঝায় এমন একটি পদ্ধতি বা সিস্টেম যা কিনা মানুষের সুখ-শান্তি বোধ উন্নত করতে সাহায্য করে, মানুষের বিপর্যস্ততা কমিয়ে দেয়, তাদের মাঝে সৃষ্টি হওয়া সঙ্কটাবস্থা সমাধান করে, সমস্যা সমাধানে সামর্থ্য বাড়ায় এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজে নিতে পারার ক্ষমতা তৈরি করে। সাইকোথেরাপি উপকারী হয়ে থাকে যারা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় ভুগছে, যা বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে।

কগনিটিভ থেরাপি
এটি নেগেটিভ চিন্তাভাবনা এবং ক্ষতিকর বিশ্বাস ভাঙতে এমন পথে চলার বা নতুন আচরণ শেখায় যাতে রোগী নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারে। এটি আপনার মাঝে তৈরি হওয়া কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস, যা প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতায় লাভ হয়েছিল সেসবকে ভিন্ন পথে, উপায়ে বা ভিন্ন পরিস্থিতিতে দেখার ক্ষমতা তৈরি করে আপনার মাঝে সমস্যার সাথে পেরে ওঠার এক প্রকার সক্ষমতা তৈরি করে দেয়। এটি মাইল্ড থেকে মডারেট ডিপ্রেশনে কার্যকরি এবং এ থেরাপিটি অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত থেরাপিস্টকে দিয়ে করানো দরকার। যেমন- এ ক্ষেত্রে থাকতে পারে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা মেন্টাল হেলথ নার্স। এ কগনিটিভ থেরাপি বিশেষভাবে কাজ করে শিশু এবং তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে।

বিহেভিয়ারাল থেরাপি
এ থেরাপি ফোবিয়া বা প্যানিক আক্রান্ত মানুষের বেলায় উপকারী হতে পারে। এ থেরাপিতে ব্যক্তি যে জিনিস বা পরিস্থিতিতে ভয় পেয়ে প্যানিকে আক্রান্ত হয় সেই জিনিস বা পরিস্থিতি ব্যক্তির সামনে ধীরে ধীরে প্রদর্শন করা হয় এবং রোগীকে বোঝানো হয় যে এগুলোর দ্বারা তার কোনো ক্ষতি হবে না বা ভয়ের কিছু নেই। এ থেরাপির দ্বারা রোগীকে তার অ্যাংজাইটি কাটিয়ে উঠতে দক্ষ করে তোলা হয়।

সাইকোঅ্যানালাইসিস
এ থেরাপিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করতে বা বলতে উৎসাহিত করা হয়। এতে করে ব্যক্তির অসচেতন চেতনা থেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়, যার কারণে ব্যক্তি আবেগগত এবং মানসিক দিক থেকে অসুস্থ হয়েছে।
সাইকোথেরাপি বা অন্যান্য থেরাপি দেয়া হয় বিভিন্ন মানসিক সমস্যায়। এসব সমস্যা হলো-

* বাইপোলার ডিসঅর্ডার
* ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার
* পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার
* সেল্প-হার্ম
* অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার
* ফোবিয়া ও প্যানিক ডিসঅর্ডার
* সিজোফ্রেনিয়া এবং
* ইটিং ডিসঅর্ডার

সাইকোথেরাপি, টকিং থেরাপি বা কগনিটিভ থেরাপি, ইনডিভিউজুয়াল থেরাপি কোন থেরাপি কোন রোগীর জন্য প্রযোজ্য তার সিদ্ধান্ত নেবেন মনোরোগ চিকিৎসক। আর অভিজ্ঞ কোনো একাডেমিক যোগ্যতাসম্পন্ন থেরাপিস্টই এসব থেরাপি দিতে পারেন। তাই এ ধরনের থেরাপি নেয়ার আগে থেরাপিস্টের একাডেমিক বা প্রফেশনাল যোগ্যতা আগে জেনে নেয়া প্রয়োজন। নয়তো ভালোর চেয়ে মন্দই হতে পারে বেশি।