সম্ভাবনাময় ড্রাগন ফল

269

ড. জে সি মালাকারড্রাগন ক্যাকটাস গোত্রের একটি ফল। ড্রাগন ফলের গাছ লতানো ইউফোরবিয়া গোত্রের ক্যাকটাসের মতো; কিন্তু এর কোনো পাতা নেই। গাছ দেখে সবাই একে চিরসবুজ ক্যাকটাস বলেই মনে করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম ড্রাগন ফল ২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম প্রবর্তন করেন। প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম এ ফলের জাত নিয়ে আসেন থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে। ড্রাগন ফলের (Hylocereus undatus) উৎপত্তিস্থল সেন্ট্রাল আমেরিকা। ভিয়েতনামে এ ফল সর্বাধিক বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়।

ড্রাগন ফুল রাতের রানি ড্রাগন গাছে ফুল ফোটে রাতে। দেখতে অনেকটা নাইট কুইন ফুলের মতো, লম্বাটে, সাদা ও হলুদ। ড্রাগন ফুলকে ‘রাতের রানি’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। ফুল স্বপরাগায়িত; তবে মাছি, মৌমাছি ও পোকা-মাকড়ের পরাগায়ণ ত্বরান্বিত করে এবং কৃত্রিম পরাগায়ণও করা যেতে পারে।

আবহাওয়া ও জমি নির্বাচন ড্রাগন ফল প্রচুর আলো পছন্দ করে। এ ফলটির জন্য শুষ্ক ট্রপিক্যাল আবহাওয়া প্রয়োজন। মধ্যম বৃষ্টিপাত এ ফলের জন্য ভালো। উপযুক্ত বৃষ্টিপাতে ফুল ঝরে পড়ে এবং ফলের পচন দেখা দেয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। তবে পানি জমে না এমন উঁচু জমিতে এ ফলের চাষ করা ভালো। উচ্চ জৈব পদার্থসমৃদ্ধ বেলে-দোঁআশ মাটিই এ ফল চাষের জন্য উত্তম।

উপযোগী জাত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সফলভাবে চাষ করার জন্য বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে অবমুক্তায়িত বাউ ড্রাগন ফল-১ (সাদা) বাউ ড্রাগন ফল-২ (লাল) চাষ করা যেতে পারে। এ ছাড়া হলুদ ড্রাগন ফল ও কালচে লাল ড্রাগন ফলও চাষ করা যেতে পারে।

রোপণ পদ্ধতি জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৩ মিটার এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩ মিটার দিয়ে এ গাছ লাগানো উত্তম। তবে অবস্থাভেদে দূরত্ব কম বা বেশি দেওয়া যেতে পারে ।

গর্তপ্রতি সারের মাত্রা ও সার ব্যবস্থাপনা ড্রাগন ফলের চারা রোপণের জন্য ২০-৩০ দিন আগে প্রতি গর্তে ৪০ কেজি পচা গোবর, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপি ১০০ গ্রাম করে এবং জিপসাম, বোরাক্স ও জিঙ্ক সালফেট ১০ গ্রাম করে দিয়ে গর্তের মাটি ওপরে-নিচে ভালোভাবে মিশিয়ে রেখে দিতে হবে। সার দেওয়ার ২০ থেকে ৩০ দিন পর গাছ লাগানো যাবে। এর পর প্রতিবছরে গাছের জন্য ৪০ কেজি পচা গোবর ঠিক রেখে ইউরিয়া ৫০ গ্রাম, টিএসপি ও এমপি ১০০ গ্রাম করে এবং জিপসাম, বোরাক্স ও জিঙ্ক সালফেট ১০ গ্রাম করে বৃদ্ধিহারে প্রয়োগ করতে হবে।

ক্যাকটাস গোত্রের গাছ বিধায় বছরের যেকোনো সময়ই লাগানো যায়; তবে এপ্রিল-সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে লাগানো ভালো। কাটিং করা কলমপ্রতি গর্তে ৪-৫টি করে লাগানো হয়। পিলারের চারদিকে কাটিং করা কলম চারা লাগিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ওপরের দিকে ছোট মোটর গাড়ির (মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার) চাকা বাঁশের চাগারের মধ্যে সেট করে খুব সহজেই এ গাছের শাখাগুলোকে বাড়তে দেওয়া যায়। দুই খুঁটি পুঁতে মোটা তারের ওপরে জাংলার মতো তৈরি করে গাছ জাংলায় তুলে চাষ করা হয়।

পরিচর্যা : চারা লাগানোর পর খুঁটি বা পিলার পুঁতে দিয়ে ড্রাগন ফল গাছ বেঁধে দিতে হবে। কেননা ড্রাগনের গাছের কান্ড লতানো প্রকৃতির। তিনটি পদ্ধতিতে খুঁটি দিয়ে গাছটি সাপোর্ট দিতে হয়।
ক. ভিয়েতনাম পদ্ধতি,
খ. ফ্লোরিডা পদ্ধতি,
গ. শ্রীলঙ্কা পদ্ধতি।

ভিয়েতনাম পদ্ধতি : এ ক্ষেত্রে পিলারের চারদিকে কাটিংকৃত কলম চারা লাগিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে দিতে হয়।

ফ্লোরিডা পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে দুই পাশে দুটি খুঁটি পুঁতে মোটা তারের উপর জাংলার মতো তৈরি করে গাছ জাংলায় তুলে দিতে হয়।

শ্রীলঙ্কা পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে পিলার পুঁতে দিয়ে চারা লাগিয়ে দিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে দিতে হয়। পিলারের চার দিকে বাঁশের চ্যাগারের উপরে মোটর গাড়ির পুরাতন টায়ার দিয়ে তার উপর গাছের শাখাগুলোকে বাড়তে দেয়া হয়।

কাটিংয়ের মাধ্যমে বংশ বিস্তার ড্রাগন ফলের বংশ বিস্তার অত্যন্ত সহজ। বীজ দিয়েও বংশ বিস্তার করা যেতে পারে। এতে ফল ধরতে একটু বেশি সময় লাগে এবং হুবহু মাতৃগুণ বজায় থাকে না। সে জন্য কাটিংয়ের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করাই উত্তম। কাটিংয়ের সফলতার হার প্রায় শত ভাগ এবং ফল তাড়াতাড়ি ধরে। কাটিং থেকে উৎপাদিত একটি গাছে ফল ধরতে ১২-১৮ মাস সময় লাগে। সাধারণত বয়স্ক এবং শক্ত শাখা কেটে (১-১.৫ ফুট) হালকা ছায়ায় বেলে-দোআঁশ মাটিতে গোড়ার দিকের কাটা অংশ পুঁতে সহজেই চারা উৎপাদন করা যায়। ২০ থেকে ৩০ দিন পরে কাটিংয়ের গোড়া থেকে শিকড় বেরিয়ে আসবে এবং তখন কাটিং মাঠে লাগানোর উপযুক্ত হবে। তবে উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রয়োজন অনুযায়ী কাটিং করা কলম সরাসরি মূল জমিতে লাগানো যায়।

গাছের আকার ও শাখা-প্রশাখা কর্তন ড্রাগন ফল গাছ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মোট শাখা তৈরি করে। একটি এক বছরের গাছ ৩০টি পর্যন্ত শাখা তৈরি করতে পারে। তবে শাখা-প্রশাখা উৎপাদন গাছের আকার ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১২-১৮ মাস পর একটি গাছ ফল ধারণ করে। ফল সংগ্রহের পর ৪০-৫০টি প্রধান শাখায় প্রত্যেকটিতে এক-দুটি সেকেন্ডারি শাখা অনুমোদন করা হয়। গাছের আকার ও শাখা-প্রশাখা কর্তনের কার্যক্রম দিনের মধ্যভাগে করাই ভালো। কর্তন করার পর অবশ্যই যেকোনো ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই আক্রমণ করতে পারে।

সেচ ব্যবস্থাপনা ড্রাগন ফল গাছ অতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারে না এবং এ ফল চাষে পানি খুব কম লাগে। শুষ্ক মৌসুমে অবশ্যই সেচ ও বর্ষা মৌসুমে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুই সারির মাঝখানে ৫০-১০০ সেন্টিমিটার আকারে নালা তৈরি করা যেতে পারে। এতে করে নালায় এক-দুই দিন পানি জমা রেখে গাছের মাটিতে রস সরবরাহ করা যেতে পারে।

অসময়ে ফল উৎপাদনের কলাকৌশল বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টারে পরীক্ষামূলক চাষে দেখা গেছে, ফল আসা শুরু হয় জুন মাসে এবং নভেম্বর মাস পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায়। শীতকালে দিবসের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে প্রতি চারটি গাছের জন্য একটি করে ৬০-১০০ ওয়াটের বাল্ব সন্ধ্যা থেকে ৫-৬ ঘণ্টা জ্বালিয়ে রেখে ফল আনা হচ্ছে এবং চাহিদা মোতাবেক সময়ে ফল নেওয়া যায়।