Home » রাজবংশের স্মৃতিচিহ্ন নাটোরের রাণী ভবানী রাজবাড়ি

রাজবংশের স্মৃতিচিহ্ন নাটোরের রাণী ভবানী রাজবাড়ি

কর্তৃক BDHeadline

বাংলাদেশের নাটোর সদর উপজেলায় অবস্থিত নাটোর রাজবাড়ি, যা নাটোর রাজবংশের একটি স্মৃতিচিহ্ন। রাণী ভবানীর স্মৃতিবিজড়িত মূল ভবনটিই ‘রাণী ভবানীর রাজবাড়ি’।

নাটোর রাজবংশের এই বাড়ির মোট আয়তন ১২০ একর, যেখানে ছোট-বড় ৮টি ভবন আছে। এছাড়া রাজবাড়ি বেষ্টন করে আছে দুই স্তরের বেডচৌকি। পুরো এলাকা ২টি অংশে বিভক্ত – ছোট তরফ ও বড় তরফ।

দশ টাকা করে টিকিট কেটে রাজবাড়িতে ঢুকলাম। ঢুকতেই প্রথমে একটি ঢালাই করা রাস্তা। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রবেশপথের দিকে তাকিয়ে দেখি, কবি জীবননান্দ দাসের কবিতার বনলতা সেনকে নিয়ে একটি পঙক্তি লেখা।

রাস্তার একপাশের গেট দিয়ে ঢুকতেই ডান পাশে বড় দীঘি। দীঘির পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ৪০০ বছরের পুরনো নাটোর রাজবাড়ি। বাংলাদেশের অনেকগুলো জমিদার বাড়ি বা পুরোনো বাড়ি দেখেছি আমি। কিন্তু এটার মতো একটাও দেখিনি!

না, আমি পজেটিভ অর্থে বলছি না। বলছি নেগেটিভ অর্থে। রাজবাড়ির বর্ণনায় পরে যাচ্ছি, আগে রাজবাড়ির আশেপাশের অংশটার বর্তমান অবস্থার বর্ণনা দেই। সামনের উঠোন জুড়ে খড় বিছিয়ে রয়েছে। কয়েকটা তাবু টাঙানো। আবার অনেকগুলো খুঁটিও গেঁথে রাখা। কোথায় রাজবাড়ির গা ছমছমে নীরবতা! আর কোথায় বা আভিজাত্য! এখানকার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে হাট বসেছে! কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাই সেসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে রাজবাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।

রাজবাড়িতে ঢুকতে প্রথমেই তোরণ আর তার মাঝখানে কামান চোখে পড়বে। ভেতরে আছে দরবার ঘর, জলসা ঘর, অন্দর মহল, শ্বেত পাথরের নারী ভাস্কর্য, প্রার্থনা ঘর আর রাজাদের ব্যবহৃত নানা দ্রব্য। কিন্তু সবঘরে তালা দেওয়া। এমনকি সিঁড়িঘরেও। আমার খুব ইচ্ছে করছিল, ছাদে উঠে দেখি। কিন্তু হলো না। এই বাড়িটার নাম “বড় তরফ”। রাণীর বড় পুত্রের বাড়ি ছিল এটি।

বড় তরফের পিছনেই আরেকটা জলাশয় দেখতে পেলাম। এই পুরো রাজবাড়ি ঘিরে প্রায় ৫০ বিঘা জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে ২টি গভীর পুকুর ও ৫টি ছোট পুকুর আছে।

আমরা বড় তরফ ঘুরে দেখে অন্যদিকে পা বাড়ালাম। রাজবাড়িকে ঘিরে আছে অনেক অনেক গাছ। দীঘির পাড়ে নারকেল, খেজুর গাছের সারি ছাড়াও আরোও কিছু ফুলের গাছ ছিল। সারবাঁধা শিউলি গাছ দেখে খুব উচ্ছলতা জেঁকে ধরলো আমাকে। ভাবছিলাম, এর সবগুলোতে যখন সাদা ফুল ফুটবে, কী সুন্দরই না লাগবে দেখতে!

সামনে এগিয়ে বিশাল এক বৈঠকখানা দেখে চোখ কপালে উঠলো। বৈঠকখানা যদি এত বড় হয়, তাহলে পাইক পেয়াদা কতজন ছিল, তাই ভাবছি। বৈঠকখানা হলেও কতগুলো রুম আছে এটায়। একটায় দরজা খোলা দেখে, এগিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে দেখি, ওখানে লোক থাকে। তারমানে বাকি ঘরগুলোতেও কেউ না কেউ থাকে। বুঝলাম না, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে থাকা পুরাতন বাড়িতে সাধারণ মানুষ কী করে থাকে?

এই ভবনের একপাশে রয়েছে লোহার তৈরি নকশাদার ঘোরানো সিঁড়ি। কিন্তু কাঁটা ফেলে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ ছাদে না যেতে পারে।

বৈঠকখানার একপাশে একটা বিশাল শিব মন্দির। রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে আটটি মন্দির রয়েছে। উল্লেখযোগ্য মন্দিরগুলো হলো শ্যামসুন্দর মন্দির, আনন্দময়ী কালিবাড়ি মন্দির, তারকেশ্বর শিব মন্দির। শিবমন্দিরে এখনো রীতি মেনে নিয়মিত পূজা হয়। তার প্রমাণ পেলাম শিবমূর্তির সামনে প্রসাদের খাবার পড়ে থাকতে দেখে।

মন্দিরকে ঘিরে আরোও আছে একটি ফণা তোলা সাপের মূর্তি, একজন বাউলের মূর্তিসহ নানা রকম শৈল্পিক কাজ। মন্দিরটির দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার শিল্পকর্ম।

রাণী মহলটিতে রাণী ভবানী বাস করতেন। এখন রাণী মহল আছে নামমাত্র। শুধু সাইনবোর্ডে লেখা দেখে চেনা যায়। এখানে একটি অতিথিশালা আছে, ভগ্নপ্রায় অতিথিশালা দেখে সে সময়কার নাটোর রাজার অতিথি সেবার নমুনা পাওয়া যায়। চলতি পথে এখানে ছোট তরফের কাছে একটি ভবনের নাম দেখলাম হ্যানি কুইন ভবন। ছোট তরফটি ছিল রাণীর ছোট ছেলের বাড়ি।

রাজবাড়ির সীমানার মধ্যেই চটপটি, ফুচকা, পেয়ারা বানানো এমনকি আদি ও আসল কাঁচাগোল্লা পর্যন্ত বিক্রি করছে! সত্যি সত্যিই একদম বাজার-হাট বানিয়ে রেখেছে রাজবাড়িটাকে। অবশ্য আমরা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরোঘুরি করায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই ফুচকার দোকানে বসে ফুচকা নিলাম এক প্লেট। মোটামুটি স্বাদ। আহামরি কিছু মনে হয়নি।

বাঘা মসজিদের পেয়ারার স্বাদ মুখে লেগে আছে। তাই এখানকার পেয়ারা বানানোও কিনে নিলাম। গতদিনের মতো অত স্বাদ না হলেও, নেহায়েত খারাপও হয়নি।

বাংলাদেশের ইতিহাসের কিংবদন্তী মেয়ে এই রাণী ভবানীর এই রাজমহলের সমৃদ্ধ এক ইতিহাস রয়েছে। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে নাটোর রাজবংশের উৎপত্তি হয়। ১৭০৬ সালে পরগণা বানগাছির জমিদার গণেশ রায় ও ভবানী চরণ চৌধুরী রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়ে চাকরিচ্যুত হন। দেওয়ান রঘুনন্দন জমিদারিটি তার ভাই রাম জীবনের নামে বন্দোবস্ত নেন। এভাবে নাটোর রাজবংশের পত্তন হয়।

রাজা রাম জীবন নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন ১৭০৬ সালে, মতান্তরে ১৭১০ সালে। ১৭৩৪ সালে তিনি মারা যান। ১৭৩০ সালে রাণী ভবানীর সাথে রাজা রাম জীবনের দত্তক পুত্র রামকান্তের বিয়ে হয়। রাজা রাম জীবনের মৃত্যুর পরে রামকান্ত নাটোরের রাজা হন। ১৭৪৮ সালে রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পরে নবাব আলীবর্দী খাঁ রাণী ভবানীর ওপর জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। রাণী ভবানীর রাজত্বকালে তার জমিদারি বর্তমান রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

রাণীর বাড়িতে এলাম, রাণী সম্পর্কে না জানলে হয়? রাণী ভবানীর পূর্ব পুরুষদের এক জমিদার তার পালিত পুত্র কৃষ্ণ নারায়ণকে স্টেট দান করেন। কৃষ্ণ নারায়ণ রাণী ভবানীর জনৈক কর্মচারীও ছিল। রাণী ভবানীর পিতার নাম আতিনাথ চৌধুরী এবং স্বামীর নাম রামকান্ত চৌধুরী। রাণী ভবানী উদারপন্থী, প্রজাবৎসল জমিদার ছিলেন। জমিদার হিসেবে তার উদারতা ও বদান্যতা ছিল প্রশংসা করার মতো।

একবার দুর্ভিক্ষ থেকে প্রজাদের বাঁচানোর জন্য তিনি শুধু খাজনা মওকুফই নয়, তার রাজকোষও খুলে দিয়েছিলেন। সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব না দিতে পারায় রাণীর জমিদারি নিলামে ওঠে। জমিদারি নিলামে উঠলে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সামনে সুবর্ণ সুযোগ এসে যায়। তিনি ঐ সময় শাহজাদপুরের জমিদারি কেনেন মাত্র তের টাকা দশ আনার বিনিময়ে।

রাজবাড়ির নির্মাণ
বিশাল জমিদারির রাজধানী নিজ জন্মভূমিতে স্থাপনের নিমিত্তে রঘুনন্দন, রাম জীবন ও পণ্ডিতবর্গ তৎকালীন ভাতঝাড়ার বিলকে নির্বাচন করেন। ভাতঝাড়ার বিল ছিল পুঠিয়া রাজা দর্পনারায়ণের সম্পত্তি। এজন্য রঘুনন্দন ও রামজীবন রাজা দর্পনারায়ণের নিকটে বিলটি রায়তী স্বত্বেও পত্তনীর আবেদন করেন। নতুন রাজাকে রাজা দর্পনারায়ণ জমিটি দান করেন। রামজীবন বিলে দীঘি, পুকুর ও চৌকি খনন করে সমতল করেন এবং রাজবাড়ি স্থাপন করেন। এলাকাটির নামকরণ করেন নাট্যপুর। ১৭০৬-১৭১০ সালে নাটোর রাজবাড়ি নির্মিত হয়েছিল। রঘুনন্দন বড়নগরে (মুর্শিদাবাদে) থাকতেন।

১৯৮৬ সাল থেকে রাজবাড়ির পুরো এলাকাটি রাণী ভবানী কেন্দ্রীয় উদ্যান বা যুবপার্ক হিসেবে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

রাজবাড়িটি অনেক বিস্তৃত জায়গা নিয়ে অবস্থিত বলে ঢুকতেই একটা মানচিত্র টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানচিত্র দেখলে বোঝা যায়, বাড়ির কোথায় কী আছে। কেউ কেউ দেখলাম ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখছেন।

যাবেন যেভাবে
ঢাকা থেকে নাটোর চার ঘণ্টার পথ। কিন্তু ভাঙা রাস্তা আর জ্যামের কারণে চার ঘণ্টায় যাওয়া যায় না। গ্রিনলাইন ও হানিফ পরিবহনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সহ শ্যামলী ও ন্যাশনাল ট্রাভেলসের বাস এ পথে নিয়মিত চলাচল করে।

এছাড়া রাজশাহী গামী যে কোনো বাসে অথবা ট্রেনে নাটোর যাওয়া যাবে। বাসে সময় লাগে ৬-৭ ঘণ্টা। ট্রেনে আরোও বেশি। নাটোরের মাদ্রাসা মোড় থেকে রিকশায় জমিদার বাড়ি। ভাড়া ২০ টাকা।

থাকবেন যেখানে
নাটোরে রাতে থাকার জন্য ভিআইপি হোটেলের নাম বলে সবাই। কিন্তু আমার কাছে এটি ওভাররেটেড মনে হয়েছে। স্টাফদের ব্যবহার ভালো না। কাছাকাছি মানের হোটেল আরপি কিংবা হোটেল মিল্লাতে থাকা যায়। এছাড়া সাধারণ মানের হোটেলের মধ্যে আরও আছে- হোটেল রুখসানা (কানাইখালিতে অবস্থিত), হোটেল উত্তরা ফকির হাটের।

সম্পর্কিত পোস্ট