যেসব বিখ্যাত ব্যক্তি মহামারি রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন

13
ছবি: সংগৃহীত

মহামারির কবলে পৃথিবী থেকে মুছে গেছে এমন জাতিসত্ত্বার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার “ইন্ডিয়ান ট্রাইব” তাদের মধ্যে অন্যতম। নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থেকে সংক্রমিত হওয়া এসব রোগ কোনো সীমারেখা মানেনি, মানেনি সমুদ্র, পাহাড় কিংবা নদীর বাধা।

টাইফয়েড, কলেরা, পীত জ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটি বসন্তের মতো মহামারি রোগগুলো বিগত কয়েক শতাব্দীতে বেশ কয়েকবার জাতীয় সরকার পতনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৭৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পীত জ্বর মহামারি আকার ধারণ করলে তৎকালীন রাজধানী ফিলাডেলফিয়াকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন শহর ছেড়ে ভার্নন মাউন্টে চলে যান। এরপর ক্ষমতাসীন কংগ্রেস কর্মীরাও একে একে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। কার্যকর সরকার ছাড়াই এই শহরবাসীকে কাটাতে হয় বেশ কয়েক মাস। শীতকালে মহামারির প্রাদুর্ভাব কমে এলে ফিরে আসেন জর্জ ওয়াশিংটন এবং তার নেতাকর্মীরা। কিন্ত ততদিনে শহরের মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ মানুষ মারা যায়।

মহামারি রোগে আক্রান্ত হওয়া বিশ্বের কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি এবং মহামারির সঙ্গে তাদের জীবন-সংগ্রাম সম্পর্কে জেনে নিই-

আব্রাহাম লিংকন
আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ওয়াশিংটন ডিসিতে গুটিবসন্ত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। দূর্ভাগ্যবশত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাব লিংকন গুটিবসন্তের টিকা গ্রহণ করেননি। ফলশ্রুতিতে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন তিনি। ধারণা করা হয়, ট্রেনে যুগে পেনসেলভেনিয়া যাওয়ার সময় তিনি সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এদিকে প্রেসিডেন্ট লিংকনের ছেলে ট্যাড আগে থেকেই গুটিবসন্তে আক্রান্ত ছিলেন। তখনকার সময় ভয়াবহ রূপ ধারণ করা এই রোগ দীর্ঘদিন ভুগিয়েছিল আব্রাহাম লিংকনকে। সংক্রমণের ভয়ে অসুস্থ থাকাকালীন তিনি তার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতাদের সঙ্গেও দেখা করেননি। এসময় তার চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন উইলিয়াম হেনরি জনসন। জনসন প্রেসিডেন্ট লিংকনকে আরোগ্য করে তুললেও নিজেই আক্রান্ত হয়ে যান। ১৯৮৪ সালের ২৮ জানুয়ারি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জনসন।

উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টাইফয়েড মহামারি আকার ধারণ করেছিল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকার কারণে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য ভাইরাসের মতোই এটি দ্রুত সংক্রমণ ঘটায়, বিশেষ করে জনাকীর্ণ এলাকায় এটি দ্রুত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ১৯১২ উইলবার রাইট আমেরিকার বোস্টনে একটা বিজনেস ট্রিপে গিয়েছিলেন। সেখানে অস্বাস্থ্যকর ওয়েস্টার (ঝিনুক) খেয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুদিন ওখানে থাকার পর সুস্থবোধ করলে তিনি ওহিয়োর ডেটন শহরে তার ভাইয়ের কাছে ফিরে আসেন। ডেটনে ফেরার পর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তারি পরীক্ষায় তার টাইফয়েড ধরা পড়ে। টাইফয়েডে ভুগে ১৯১২ সালের ১২ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর অরভিল রাইট মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কোম্পানি পরিচালনা করার মতো যথেষ্ট শারীরিক সক্ষমতা তার ছিল না। তাই ১৯১৫ সালে তিনি ‘The Wright Company’ বিক্রি করে দেন।

জর্জ ওয়াশিংটন
মার্কিন মুল্লুকে বিপ্লবী যুদ্ধ চলাকালীন কন্টিনেন্টাল সেনাবাহিনীতে সংক্রামক যৌনরোগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে যায়। এই যৌনরোগগুলোর মধ্যে সিফিলিসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গিয়েছিল। তখনো পারদ ছাড়া এই রোগের অন্যকোনো চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। বিষাক্ত এই পারদ প্রাথমিকভাবে এই রোগের উপসর্গ কমাতে সক্ষম হলেও একেবারে রোগ সারাতে পারেনি। জর্জ ওয়াশিংটন অসুস্থদের তালিকা করে এবং যারা এই রোগ ছড়িয়েছে তাদের সম্ভাব্য তালিকা করে শাস্তির ব্যবস্থা করেন। এরপর থেকে অনেক সৈন্য নিজদের রোগের কথা গোপন করে এবং পালিয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে চিকিৎসা নিতে থাকে, ফলে সেকেন্ডারি ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে এই রোগ লোকালয়েও ছড়িয়ে যায়। বিপ্লবী যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের ২৫ ভাগই মারা গিয়েছিল সংক্রামক যৌনরোগে।

জর্জ ওয়াশিংটন ও স্যার রোনাল্ড রস
ম্যালেরিয়া রোগটি সিজনাল অসুখ হিসেবে বিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। বহু লোক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতে এসেও প্রতি বছর পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নিজেও যৌবনকালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। স্যার রোনাল্ড রস কলকাতার প্রেসিডেন্সি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৮৯৭ সালে তিনি মশার দেহে ম্যালেরিয়া ভাইরাসের জীবনচক্র আবিষ্কার করেন। ম্যালেরিয়ার প্রতিশেধক এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে কুইনিন দ্বারা এই রোগের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত এই রোগের একমাত্র প্রতিরোধক হলো মশক নিধন।

জেমস নক্স পোক
মাত্র এক মেয়াদ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে ১৮৪৯ সালে জেমস নক্স পোক হোয়াইট হাউস ত্যাগ করেন। তখন তার বয়স ছিল ৫৪ বছর। এই স্বল্প সময়েই টেক্সাসের অন্তর্ভুক্তি, মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধ এবং গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে ওরেগন সীমান্ত বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানসহ তিনি সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শান্তি এবং সমৃদ্ধির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে তিনি তার সদ্য কেনা নেশভিলের বাড়িতে চলে আসেন। অনেক আগে থেকেই তার ইচ্ছা ছিল আমেরিকার দক্ষিণ অংশ ঘুরে দেখা। ১৮৪৯ সালের মার্চে তিনি তার ভ্রমণযাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ততদিনে ওই অঞ্চলে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। ভ্রমণের শুরুর দিকেই তিনি ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। যদিও অতটা গুরুত্ব দেননি। পোক জানতেন যে লুসিয়ানায় কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। তবু তিনি যেকোনো উপায়েই হোক নিউ অরলেন্স যেতে চেয়েছিলেন। এই যাত্রাই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নৌকায় করে মিসিসিপি হয়ে নিউ অরলেন্সে যাওয়ার পথেই কলেরায় আক্রান্ত হন তিনি। অসুস্থ অবস্থাতেই ২ এপ্রিল নেশভিলে ফেরত আসেন। এরপর অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেও জুন মাসের দিকে তিনি আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় ১৮৪৯ সালের ১৫ জুন কলেরা আক্রান্ত হয়েই মারা যান তিনি।

ওয়াল্ট ডিজনি
১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ১৭ বছর বয়সি দুঃসাহসিক কিশোর ওয়াল্ট ডিজনি ইউরোপ অভিবাসী মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রেড ক্রস অ্যাম্বুলেন্স কর্পসে ভর্তি হয়েছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল ফ্রান্সে অবস্থিত মার্কিন সেনাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া। শিকাগোতে ট্রেনিংরত অবস্থায় তিনি স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হন। তখন বিশ্বজুড়ে স্প্যানিশ ফ্লু ছিল এক মৃত্যু আতঙ্কের নাম। ওয়াল্ট ডিজনির আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনে তার বাবা-মা শিকাগোতে চলে আসেন এবং তাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কয়েক সপ্তাহ পর ডিজনি আরোগ্য লাভ করেন এবং পুণরায় ট্রেনিংয়ে যোগ দেন। ট্রেনিং শেষে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়। ওখানে থাকা অবস্থায় সামরিক পত্রিকা স্টারস অ্যান্ড স্টাইপসের সম্পাদক তার সৃজনশীলতা দেখে মুগ্ধ হন। তার সহযোগিতায় ১৯১৯ সালের শুরুর দিকে তার আঁকা কার্টুন ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

রাণী প্রথম এলিজাবেথ
১৫৬২ সালের ১০ অক্টোবর রাণী প্রথম এলিজাবেথ যখন অসুস্থ হন, রাজবৈদ্যরা ধারণা করেছিল তার ঠান্ডা লেগেছে। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তার জ্বর আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় এবং গুটি বসন্তের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। রাণীর ঘনিষ্ট বান্ধবী ও রাজবৈদ্য লেডি মেরি সিডনি তার এক রোগীর কাছ থেকে এই রোগে সংক্রমিত হয়েছিলেন। তার মাধ্যমেই রাণীর শরীরে গুটি বসন্ত সংক্রমিত হয়। এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করার পর লেডি মেরী সিডনি অনুশোচনায় ভুগতে থাকেন এবং নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে ফেলেন যাতে অন্য কেউ এই রোগে সংক্রমিত হতে না পারে। বেশ কিছুদিন গুটি বসন্তের সঙ্গে লড়াই করে রাণী সুস্থ হয়ে উঠেন। কিন্তু তার শরীরে এবং মুখে বসন্তের বেশ কিছু দাগ থেকে যায়। এছাড়াও এই রোগের প্রভাবে মাত্র ৩০ বছর বয়স থেকেই রাণীর মাথার চুল পড়তে শুরু করে। মাথার টাক ঢাকতে তিনি পরচুলা ব্যবহার করতেন।