যেসব কারনে লিভার ড্যামেজ হয়

33
ছবি: সংগৃহীত

লিভারের প্রধান কাজ হচ্ছে পরিপাকতন্ত্র থেকে আসা রক্ত শরীরের অন্যান্য অংশে যাওয়ার পূর্বে পরিস্রাবণ করা। কেমিক্যালকে বিষমুক্ত করা, রক্ত জমাট বাধা ও ওষুধের বিপাকেও এ অঙ্গ ভূমিকা রাখে।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে, কিছু বিস্ময়কর কারণে এ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। এ প্রতিবেদনে লিভারে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে এমন কিছু বিস্ময়কর কারণ উল্লেখ করা হলো।

১. চিনি
অতিরিক্ত চিনি শুধু আপনার দাঁতের জন্যই খারাপ নয়, এটি লিভারেরও ক্ষতি করতে পারে। অত্যধিক পরিশোধিত চিনি ও হাই ফ্রুকটোজ কর্ন সিরাপ লিভারে চর্বি জমিয়ে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে, চিনি লিভারে অ্যালকোহলের মতো ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি আপনার অতিরিক্ত ওজন না থাকলেও। একারণে লিভারকে সুস্থ রাখতে সংযোজিত চিনির খাবার সীমিত করুন, যেমন- কোমল পানীয়, প্যাস্ট্রি ও ক্যান্ডি।

২. হার্বাল সাপ্লিমেন্ট
হার্বাল প্রোডাক্টের লেবেলে ‘প্রাকৃতিক’ লেখা থাকলেও এটি আপনার জন্য ভালো নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ কেউ মেনোপজের (মাসিক চক্রের স্থায়ী সমাপ্তি) উপসর্গ প্রশমিত করতে অথবা নিজেদেরকে শিথিল করতে কাভা কাভা নামক হার্ব ব্যবহার করেন। কিন্তু গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, এটি লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এর ফলে হেপাটাইটিস ও লিভার ফেইলিউরের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিছু দেশে এ হার্বকে নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। আপনার লিভারকে ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে যেকোনো হার্বাল প্রোডাক্ট ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন যে সেটা নিরাপদ কিনা।

৩. অতিরিক্ত ওজন
আপনার লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে আপনার লিভার ফুলে যেতে পারে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লিভার শক্ত হয়ে যায় ও সেখানে ফাইব্রোসিস বা স্কার টিস্যু গঠিত হয়। ফাইব্রোসিসের শেষ পর্যায়কে চিকিৎসকেরা সিরোসিস বলেন। আপনার ওজন যত বাড়বে অথবা আপনি যত বেশি স্থূল হবেন, আপনার ফ্যাটি লিভার ডিজিজের ঝুঁকি তত বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া মধ্যবয়স্ক লোক ও ডায়াবেটিস রোগীদেরও এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চা এ রোগ প্রতিরোধ করতে পারে।

৪. ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট
আপনার শরীরের জন্য ভিটামিন এ প্রয়োজন। সবচেয়ে ভালো হয় সতেজ ফল ও শাকসবজি থেকে গ্রহণ করলে, বিশেষ করে লাল, কমলা ও হলুদ রঙের উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে। কিন্তু উচ্চ ডোজের ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট লিভারে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, হয়তো আপনার এই সাপ্লিমেন্টের দরকার নাও হতে পারে।

৫. কোমল পানীয়
গবেষণায় পাওয়া গেছে, যেসব লোক প্রচুর পরিমাণে সফট ড্রিংকস বা কোমল পানীয় পান করেন তাদের নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের ঝুঁকি বেশি। কোমল পানীয়তে হাই ফ্রুকটোজ কর্ন সিরাপ থাকে, যেখানে ফ্রুকটোজ ৫৫% ও গ্লুকোজ ৪৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী সংযোজিত চিনির প্রধান উৎস হচ্ছে কোমল পানীয়- যার সঙ্গে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক সিন্ড্রোমের যোগসূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। নিয়মিত কোমল পানীয় পান করলে ফ্রুকটোজের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে লিভারে চর্বি সঞ্চিত হয়, যা নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের কারণ হতে পারে।

৬. অ্যাসিটামিনোফেন
সাধারণত অধিকাংশ লোকজন পিঠে ব্যথা অনুভব করলে কিংবা মাথাব্যথায় ভুগলে অথবা ঠান্ডা লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করে থাকেন। কিন্তু সঠিক ডোজে সেবন করছেন কিনা সতর্ক থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি না জেনে উচ্চ ডোজে অ্যাসিটামিনোফেন (প্যারাসিটামল) গ্রহণ করলে লিভারের ক্ষতি হতে পারে। অ্যাসিটামিনোফেন রয়েছে এমন মাথাব্যথার ওষুধ ও ঠান্ডার ওষুধ একসাথে সেবন করলে ডোজ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। একারণে আপনি কি কি ওষুধ সেবন করছেন তা চিকিৎসককে জানাতে ভুলবেন না।

৭. ট্রান্স ফ্যাট
ট্রান্স ফ্যাট হচ্ছে মানুষের তৈরিকৃত চর্বি যা কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবার ও বেকড খাবারে থাকে। খাবারের লেবেলে ‘পার্শিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড’ লেখা থাকলে বুঝে নিতে পারেন যে সেখানে ট্রান্স ফ্যাট রয়েছে। উচ্চ ট্রান্স ফ্যাটের ডায়েট ওজন বৃদ্ধি করে। এটা কিন্তু লিভারের জন্য ভালো নয়। লিভারের সুস্থতা বজায় রাখতে খাবারের লেবেল চেক করুন। এমনকি সেখানে ০ গ্রাম ট্রান্স ফ্যাট উল্লেখ থাকলেও অল্প পরিমাণে এ ক্ষতিকারক চর্বি পাবেন।

৮. নিডল
রোগীর ওপর ব্যবহার করা নিডল দুর্ঘটনাবশত চিকিৎসক বা নার্সের শরীরে গেঁথে গেলে অথবা অবৈধ ড্রাগস ইনজেক্ট করার নিডল পরস্পরে শেয়ার করলে লিভার ঝুঁকিতে থাকে। সমস্যা নিডলে নয়, সেখানে যা লেগে আছে তা সমস্যার কারণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নিডলে লেগে থাকা রক্তের মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি ছড়াতে পারে। অন্যজনে ব্যবহার করেছে এমন নিডল শরীরে বিদ্ধ হলে অথবা অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টর (যেমন- আপনার এইচআইভি রয়েছে অথবা আপনি গর্ভে থাকা অবস্থায় আপনার মায়ের হেপাটাইটিস সি ছিল) থাকলে টেস্ট করে দেখা উচিত।

সূত্র: ওয়েব এমডি