মেঘ জলে ভাসেন

363
ছবি: সংগৃহীত

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি কাপ্তাই হ্রদ। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহত্ এই কৃত্রিম হ্রদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত, পাহাড়ি ঝরনাধারা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, অথৈ পানি আর সবুজের সমারোহ, গাঢ়-সবুজ বন, গাছ-গাছালি ফুল-ফল আর উপজাতিদের জীবনধারা কাপ্তাই লেকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হ্রদটি নানা প্রজাতির মাছ ও জীববৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধ প্রাণভাণ্ডার।

চারদিকে নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য, পাহাড়-পর্বত, ঝরনাধারা, আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা, অথৈ পানি আর সবুজের সমাহারে পরিপূর্ণ নানা বৈচিত্র্যের এক লীলানিকেতন কাপ্তাই হ্রদ। পার্বত্য জেলা রাঙামাটিজুড়ে অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহত্ কৃত্রিম হ্রদ এটি। লেকের পানিতে অজস্র মাছ আর জীববৈচিত্র্যের সমাহার। পাহাড়ের গায়ে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ আর সুবজের সম্ভার। সব মিলিয়ে কাপ্তাই লেক পর্যটন, প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের এক বিশাল ভাণ্ডার।

রাঙামাটিসহ বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত মিঠাপানির এই হ্রদটির আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। বর্গমাইল হিসাবে এর আয়তন ২৫৬ বর্গমাইল, যা দেশের পুকুরগুলোর মোট আয়তনের ৩২ শতাংশ ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যে তৈরি হলেও মত্স্য উত্পাদন, দেশি-বিদেশি মুদ্রা উপার্জন, জেলে ও মত্স্য ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়দের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জীবন-জীবিকা থেকে শুরু করে দেশের সামগ্রিক মত্স্যক্ষেত্রে কাপ্তাই লেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

কাপ্তাই হ্রদ মূলত কর্ণফুলী হ্রদের আঞ্চলিক নাম। এ হ্রদ সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের বাঁধটি পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত। বাঁধের অবস্থানস্থল কাপ্তাইয়ের নাম অনুসারে স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে কাপ্তাই হ্রদ হিসেবে বলতে থাকে, যা কোনো কোনো নথিপত্রে কর্ণফুলী হ্রদ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে। কাপ্তাই বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ১৯৬১ সালের মে মাসে এর স্পিলওয়ে বন্ধ করা হয়। বাঁধ নির্মাণের আগে বর্তমান হ্রদটি ছিল ছোট-বড় পাহাড়, টিলা ও উপত্যকা পরিবেষ্টিত এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যময় স্থলভূমি। যার উপত্যকা ও পাহাড়ের ঢালুপৃষ্ঠ চাষাবাদের কাজে ব্যবহার হতো। আসামের লুসাই পাহাড় থেকে সৃষ্ট কর্ণফুলী নদী বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে আসা কাসালং, মাইনি, রিংকং এবং চেঙ্গী নদীর মিলিত প্রবাহ স্থলভাগের ওপর দিয়ে কর্ণফুলী নামে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হতো। কাপ্তাইয়ে বাঁধ দেয়ার ফলে এসব নদী ও আশপাশের নিচু এলাকাসহ বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে এ হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।

কাপ্তাই বাঁধটি চট্টগ্রাম শহর থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ৫৬ দশমিক ৩১ কিলোমিটার এবং বঙ্গোপসাগরের তীর থেকে ৬৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হ্রদের জলায়তন প্রায় ৫৮ হাজার ৩০০ হেক্টর, যা বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টরে গিয়ে দাঁড়ায়। এর গড় গভীরতা হয় ৯ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ৩৬ মিটার। মৌসুমভেদে গভীরতার তারতম্য হয় ৮ দশমিক ১৪ মিটার।

আকৃতির দিক থেকে কাপ্তাই হ্রদ অনেকটা ইংরেজি এইচ (ঐ) অক্ষরের মতো। মাইনি ও কাসালং খালের সম্মিলিত প্রবাহের সঙ্গে নিম্নাঞ্চলে মূল কর্ণফুলী নদীর প্রবাহ মিলে হ্রদটির ডানদিকের সুদীর্ঘ ও বৃহত্তর অংশটি সৃষ্টি হয়েছে। বাঁদিকের রাঙামাটি-কাপ্তাই অংশটি সৃষ্টি হয়েছে উত্তরদিক থেকে আসা চেঙ্গী নদী থেকে প্রবাহিত ধারার সঙ্গে নিম্নাঞ্চলে দক্ষিণ-পূর্বদিক থেকে আসা রাইংখিয়ং বা রিংকং নদীর প্রবাহের মিলনের ফলে। হ্রদের এই বিশাল জলাধার দুটির মাঝখানে সরু ও সুগভীর শুভলং চ্যানেল (মূলত কর্ণফুলী নদীর প্রবাহ) দ্বারা যুক্ত হয়েছে।

হ্রদের তটাঞ্চল প্রায়ই পাথরময় এবং তলদেশ খুবই অসমতল। একমাত্র মূল নদীবক্ষগুলো ছাড়া প্রায় সর্বত্রই যুক্ত টিলা, পাথরের চাঁই (বিশালাকারের পাথরের টুকরো) এবং পরিত্যক্ত বড় বড় গাছের গুঁড়ি রয়েছে। ফলে সহজে এবং সব জায়গায় মাছ ধরা যায় না। পাহাড়ের পাদদেশে সমতল এলাকার মাটি পাহাড়ের উপরের পৃষ্ঠের মাটি অপেক্ষা ভারী বুনটের ও প্রায়ই মিহি কাদাময়। অন্যদিকে পাহাড় ও টিলাপৃষ্ঠের মাটি অপেক্ষাকৃত হালকা বুনটের, লাল ও বেলে বা বেলেজাতীয়। হ্রদ এলাকার অধিকাংশ উঁচু জমি জুম চাষ ও বনায়নে এবং তুলনামূলক নিচু ও জলে ভাসা জমি কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়।

কাপ্তাই লেক দেখার জন্য যেতে হবে রাঙামাটি। রাঙামাটি প্রবেশ করতেই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত বেষ্টিত ঘন-সবুজ অরণ্যে অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য সবার মন কেড়ে নেয়।

কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টি হওয়ার কারণে রাঙামাটিতে গড়ে ওঠে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। ৭০ দশকের শেষদিকে সরকার রাঙামাটি জেলাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে এবং পর্যটন করপোরেশন পর্যটকদের সুবিধার্থে আকর্ষণীয় স্পট স্থাপন করে। পর্যটন করপোরেশন স্পটে হোটেল, অফিস এবং দুই পাহাড়ের মাঝখানে একটি আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতু স্থাপন করে।

কাপ্তাই লেকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ শুভলং ঝরনা ও এর আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য। বর্ষায় ঝরনাটি পরিপূর্ণ রূপ মেলে ধরে। চারদিকে বিশাল বিশাল সবুজ পাহাড়ঘেরা এই ঝরনায় পানি পড়ার দৃশ্য সত্যিই অপরূপ। তবে শুকনো মৌসুমে ঝরনায় পানি কম থাকে। শুভলংয়ের আশপাশের পাহাড়গুলো খুবই খাড়া, উঁচু ও নয়নাভিরাম। ইঞ্জিন নৌকায় কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশির বুক চিরে শুভলংয়ের দিকে যত এগোবেন, ততই ভালো লাগায় ভরে উঠবে মন।

কিভাবে যাবেন
ঢাকা হতে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত সরাসরি বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। ঢাকা হতে বেশ কয়েকটি বাস প্রতিদিন ছেড়ে যায় রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে। শ্যামলী, সায়েদাবাদ, কলাবাগান হতে প্রতিদিনই গ্রীনলাইন, এস.আলম, ইউনিক সার্ভিস বাসগুলো ছাড়ে। এগুলোর মাধ্যমে সরাসরি চলে যেতে পারেন রাঙ্গামাটি।

অথবা ঢাকা হতে বাস, ট্রেনে কিংবা বিমানে করে যেতে পারেন চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম হতে অনেকগুলো বিলাশবহুল ও লোকাল বাস সার্ভিস রয়েছে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত। সেগুলোর মাধ্যমেও পৌছতে পারেন রাঙ্গামাটি। তবে সরাসরি বাস সার্ভিসই ঝামেলা ও ঝুক্কিমুক্ত।

কোথায় থাকবেন
থাকার জন্য রাঙ্গামাটিতে সরকারী বেসরকারী অনেকগুলো হোটেল ও গেষ্ট হাউজ রয়েছে। তাছাড়া আরো কিছু বোডিং পাওয়া যায় থাকার জন্য। বোডিংগুলোতে খরচ কিছুটা কম তবেথাকার জন্য খুব একটা সুবিধার নয়।

পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স
১২ টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম রয়েছ। প্রেতিটির ভাড়াঃ ১৭২৫ টাকা
৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রনহীন রুম রয়েছে প্রতিটির ভাড়াঃ ৮০৫ টাকা
যোগযোগ: ০৩৫১-৬৩১২৬ (অফিস)

হোটেল সুফিয়া
২৭ টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম রয়েছ। প্রেতিটির ভাড়াঃ ৯০০ টাকা (একক), ১২৫০ (দ্বৈত)
৩৫টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রনহীন রুম রয়েছে প্রতিটির ভাড়াঃ ৬০০ টাকা
যোগাযোগ: ০৩৫১-৬২১৪৫, ৬১১৭৪, ০১৫৫৩৪০৯১৪৯

হোটেল গ্রীন ক্যাসেল
৭ টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম রয়েছ। প্রেতিটির ভাড়াঃ ১১৫০ হতে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত
১৬টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রনহীন রুম রয়েছে প্রতিটির ভাড়াঃ ৭৫০ হতে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত
যোগাযোগ: ০৩৫১-৭১২১৪, ৬১২০০, ০১৭২৬-৫১১৫৩২, ০১৮১৫-৪৫৯১৪৬

এছাড়াও রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হোটেল যেমন: হোটেল জজ, হোটেল আল মোবা, হোটেল মাউন্টেন ভিউ, হোটেল ডিগনিটি, হোটেল সাফিয়া, হোটেল ড্রিমল্যান্ড ইত্যাদি

খাওয়া দাওয়া
রাঙ্গামাটি এসে স্থানীয় আদিবাসীদের খাবার না খেলে পুরো ভ্রমনটাই অপূর্ন থেকে যায়। তাই ইচ্ছে করলে এবং যদি কপাল ভাল হয় তবে আপনও স্বাদ নিতে পারেন আদিবাসীদের হরেক রকম খাবারের। এদের অনেকগুলো পদের মধ্যে কয়েকটি পদ খুবই ভিন্ন প্রকৃতির ও সুস্বাদু।

কয়েকটি পদ:
বিগল বিচি
বিগল বিচি দেখতে ছোট ছোট দানার মতো- হালকা করে তেলে ভাজা হয়। এমনিতে এর কোনো স্বাদ নেই। এটি মূলত খেতে হয় শুটকি মাছ ও কাঁচামরিচের ভর্তার সাথে। তখনই আসল স্বাদ পাওয়া যায়।

কচি বাঁশের তরকারী
এটি একটি অসাধারণ আইটেম। রাঙ্গামাটি এসে এই খাবারটি হতে কেউ বঞ্চিত হতে চায় না। কচি বাঁশের তরকারি। স্বাদ অসাধারণ! পুঁই বা অন্যান্য শাকের সাথে এটি রান্না করা যায়, অথবা ভাজি। যে ভাবেই খান না কেন এটি হবে আপনার জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা। কচি বাঁশ খেতে খুবই নরম- মুখে দেওয়া মাত্র গলে যায়। আসলে এগুলোর স্বাদ বলে বুঝানো যাবে না! বুঝতে হলে খেতে হবে!

কেবাং
এটি আসলে খাবার রান্নার একটি পদ্ধতি। শক্তসামর্থ বাঁশের খোলের ভেতর শূকর ভরে সেখানে তেল-মশলা দিয়ে বাঁশটিকে পোড়ানো বা ঝলসানো হয়েছে। তবে আপনি শুকর খেতে না চাইলে কাঁচকি বা অন্যান্য মাছ, মাংস ইত্যাদির কেবাং করে খেতে পারেন। এর স্বাদ এবং অভিজ্ঞতা আপনাকে স্মৃতির পাতা ঘুড়াবে সারাজীবন।

কাঁচকি ফ্রাই
এটি অবশ্য আদিবাসী কোন খাবার নয়। তবে এর স্বাদ অতুলনীয়। সাধারণ পদ্ধতিতেই বড় বড় কাচকি মাছ তেলের উপর ভাজা হয়। গরম গরম খেতে ভীষন মজার খাবার এটি। রাঙ্গামাটির অনেক হোটেলেই এই খাবারটি পাবেন।

দোচুয়ানি
যাদের এক আঁধটু সুরা পানের অভ্যাস আছে তাদের জন্য এটি আর্শিবাদ। দোচুয়ানি- স্থানীয় পদ্ধতিতে বানানো মদ বিশেষ। বিশেষ ধরনের চালের ভাত এবং পাহাড়ি লতাপাতার মিশ্রণে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বানানো হয় দোচুয়ানি। তবে ভয়ের কিছু নেই, স্থানীয় ভাবে তৈরি হলেও এটি একেবারেই স্বোস্থসম্মত। বিভিন্ন স্বাদের দোচুয়ানি পাওয়া যায়। এটি সাধারণত ঝাঝালো স্বাদ ও বর্নহীন হয়ে থাকে। আবার অনেকগুলো দোচুয়ানি থাকে এলাচ দেয়া। যেটাটে এলাচের সুগদ্ধ থাকে। আপনি হোটেলের যে কোন ছেলেকে বললে এবং সামান্য বকশিশ দিলে সেই জোগার করে দেবে পাহাড়ী মদ দোচুয়ানি।

সূত্র: কালের কন্ঠ