Home » ভিন্ন চোখে খাগড়াছড়ি

ভিন্ন চোখে খাগড়াছড়ি

কর্তৃক BDHeadline

খাগড়াছড়ি নামটির সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। এই নামটির সাথে আমাদের মনে জড়িয়ে আছে পাহাড়, ঝর্ণা সহ নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা। আর্টিকেলের হেডলাইন দেখে আপনার হয়তো মনে হতে পারে খাগড়াছড়ি সম্পর্কে পাহাড়-ঝর্ণা বা গুহা ছাড়া নতুন করে আর কী-ই বা জানার আছে!

ইন্টারনেটে খাগড়াছড়ি নিয়ে যতগুলো ফিচার রয়েছে তাঁর সবগুলো বলব না, তবে অধিকাংশই লেখা হয়েছে খাগড়াছড়ি জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে। তাই আমি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে লিখছি। চলুন তবে ভিন্ন চোখে দেখে নিই খাগড়াছড়ি জেলা।

শান্তিপুর অরণ্য কুটির
দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তি কোথায় রয়েছে জানেন কি? এটি রয়েছে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির শান্তিপুর অরণ্য কুটিরে। এটি শুধু এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তিই নয়; এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তিও, যা উচ্চতায় ৫০ ফুট। মুর্তিটি ১৯৯৯ সালে নির্মাণ করা হয়।

শান্তিপুর অরণ্য কুটির উল্টাছড়া ইউনিয়নের শান্তিপুর নামক গভীর অরণ্য বেষ্টিত বনভূমিতে ৬৫ একর জায়গার উপর বিস্তৃত, যা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শান্তির প্রতীক ও গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এখানে নানা আয়োজনের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসালয়, পাঠাগার, ভিআইপি বিশ্রামাগার, অফিসকক্ষ, পূণ্যার্থীদের বিশ্রামাগার এবং কনফেকশনারি দোকান।

বুদ্ধ মূর্তির দু’পাশে সিবলী মন্দির ও উপগুপ্ত কাঠের মন্দির রয়েছে। এর সামনে সুসজ্জিত প্রার্থনা স্থান ও বাতিঘর। পেছনে রয়েছে ১৩টি সাধনা কুটির, যেখানে ভান্তেরা দিনের পর দিন সাধনা করে চলেছেন।

এছাড়া শান্তিপুর অরণ্য কুটিরে একটি বেড়ার ঘর রয়েছে। এটি একটি প্রতীকী ঘর, যা রাধামন ধনপতি নামক এক বুদ্ধ ভক্তের বিশ্রাম ঘরের প্রতীক রূপে নির্মাণ করা হয়েছে। আকর্ষণীয় উৎসব কঠিন চীবর দানের সময় ভক্তরা এখানে তুলা থেকে কাপড় বোনার কাজে অংশ নেন।

হাতি মাথা/হাতিমুড়া
হাতিমুড়া/মায়ুং কপাল মূলত একটি পাহাড়ি উঁচু পথ। খাড়া উঁচু পাহাড়ের সামনের দিকটা দেখতে হাতির মাথার মতো হওয়ায় কেউ কেউ একে হাতি মাথাও বলে থাকে। চাকমা ভাষায় বলা হয়, এঁদো সিরে মোন। পাহাড়ের গায়ে বনের ফাঁকে ফাঁকে খাড়া উঠে যাওয়া এই সিঁড়ির শেষ দেখা যায় না বলে একে অনেকে স্বর্গের সিঁড়িও বলে থাকে।

এই স্বর্গের সিঁড়িটি খাগড়াছড়ি জেলার সদর উপজেলার পেরাছড়া ইউনিয়নে অবস্থিত। খাড়া পাহাড় ডিঙিয়ে যাওয়া দুর্গম এই পথটি মূলত ১৫টি গ্রামের যাতায়াত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আগে এখানে কোনো সিঁড়ি ছিল না। বর্তমানে সরকারী উদ্যোগে এখানে ৩৮০ ফুট লম্বা একটি লোহার সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এই সিঁড়ি দিয়ে যাতায়াত করে সদর উপজেলা ও মাটিরাঙ্গা উপজেলার ভাঙ্গামুড়া, বাদলছড়া, মাখণ তৈসা পাড়া, কিনাপা পাড়া, হাজা পাড়া,বগড়া পাড়া, কেশব মহাজনপাড়া, সাধুপাড়া, কাপতলাপাড়া গ্রামের মানুষেরা।

দেবতার পুকুর
পুকুর কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু সেটা যদি হয় দেবতার পুকুর! যারা আগে কখনো দেবতার পুকুর দেখেননি বা এই জায়গা সম্পর্কে আগে থেকে জানেন না তাদের কাছে বিষয়টি কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ আমি এখন বলছি এমন এক পুকুরের কথা, যা সমুদ্র সমতল হতে ৭০০ ফুট উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।

কথিত আছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের জ্বলের অভাব পূরণ করার জন্য স্বয়ং জ্বল দেবতা এক আমাবস্যা রাতে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের মাধ্যমে এই পুকুর খনন করেন। তাই এই পুকুরের নাম ‘দেবতার পুকুর’। ত্রিপুরাদের ভাষায় একে বলা হয় ‘মাতাই পুখির’। মাতাই অর্থ দেবতা আর পুখির অর্থ পুকুর। এই দেবতার পুকুরটি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কাছে পূজনীয়। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে পুণ্য লাভের আসায় এখানে সমবেত হন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ। তখন এখানে তীর্থ মেলা বসে।

দেবতার পুকুরটি বর্ষাকালে বর্ষার পানিতে কানায় কানায় ভরে যায়, আর সেই পানি থাকে সারা বছর। বছরের কোনো সময় এই পানি শুকিয়ে যায় না। স্থানীয়রা মনে করেন, পুকুরটি দেবতার দান বলেই এত উঁচুতে থাকা সত্ত্বেও এর পানি কখনো শুকায় না। পুকুরের পানিকে এরা দেবতার আশীর্বাদ বলে মনে করেন।

পুকুরের চারদিকে ঘন বন রয়েছে, যা দেখে মনে হতে পারে পুকুরটি খননে শুধু জল দেবতারই নয় সৌন্দর্য দেবতারও হাত ছিল। বন পেরিয়ে সুবিস্তৃত পর্বতশ্রেণী যেন সৌন্দর্য দেবতারই প্রকাশ করে।

চির প্রশান্তিময় দেবতার পুকুরটি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার নূনছড়ি মৌজায় অবস্থিত।পুকুরটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১,৫০০ ফুট এবং প্রস্থে প্রায় ৬০০ ফুট।

মানিকছড়ি মং রাজার বাড়ি
খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার মং সার্কেলের রাজবাড়িটি মং রাজার বাড়ি নামে পরিচিত। মানিকছড়িতে মূলত কংজয়ের (১৭৯৬-১৮২৬) রাজত্বের মধ্য দিয়ে মং রাজপরিবারের যাত্রা শুরু হয়।

কংজয় একসময় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সন্তুষ্টি লাভ করেছিলেন এবং তখন তিনি ত্রিপুরা রাজকন্যা চন্দ্রাকে বিয়ে করেন। এসময় তিনি সীতাকুন্ডু থেকে ৫০০ ত্রিপুরা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে মানিকছড়ি এসে রাজত্ব স্থাপন করেন।

কংজয়ের পরে তাঁর পুত্র কিউজাই সেন মাত্র সাত বছর বয়সে রাজ্যভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে কিউজাই সেন মং সার্কেলের প্রধান নিযুক্ত হন এবং মানিকছড়ির রাজবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে আরো ছয় জন মং সার্কেলের প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং এখানে রাজত্ব করেছিলেন।

মং সার্কেলের সপ্তম রাজা মং পরু সাইনের মাধ্যমে মং সার্কেলের সমাপ্তি ঘটে। মং পরু সাইন ১৯৮৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

এখানে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, রাজার সিংহাসন, মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্মৃতিবাহী অনেক নিদর্শন।

সম্পর্কিত পোস্ট