Home » বাংলার বুকে অনন্য সৌন্দর্য দুবলার চর

বাংলার বুকে অনন্য সৌন্দর্য দুবলার চর

কর্তৃক BDHeadline

Tour-bd.com: দুবলার চর বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি দ্বীপ যা চর নামে পরিচিত। জায়গাটি হিন্দুধর্মের পূণ্যস্নান, রাসমেলা এবং হরিণের জন্য বেশ জনপ্রিয়। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে এটি একটি বিচ্ছিন্ন চর।

চাঁদপাই রেঞ্জের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এই দুবলার চর। এই চরের মোট আয়তন ৮১ বর্গমাইল। জায়গাটি বাগেরহাটের একটি জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা। এখানকার চারপাশ জুড়ে রয়েছে নানা বৈচিত্র‍্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যে সকল কারণে বাগেরহাটের দুবলার চর বেশ জনপ্রিয় তা এক নজরে জেনে নেয়া যাক।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অসাধারণ চিত্র
দুবলার চর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভরা একটি জায়গা। বালি, পানি, গাছপালা, পশু, পাখি ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদানে পূর্ণ জায়গাটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। চরের বুকে পা ফেলে হেঁটে হেঁটে চারপাশের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার পরিমাণ অনেকটা বাড়িয়ে তোলে মাথার উপরের বিশাল আকাশ। এ চরে দাঁড়িয়ে আকাশের সৌন্দর্য ভিন্নভাবে উপভোগের সুযোগ পেয়ে যাবেন। তাছাড়া জলে ভরা এখানকার চারপাশের সুন্দর জায়গাগুলো তো থাকছেই। নৌকায় ভেসে বেড়িয়ে এখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন একেবারেই আলাদা। আপনার ভ্রমণকালে চোখে পড়বে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য অসাধারণ দৃশ্য।

জেলে গ্রাম ও মাছের বাহারি শুঁটকি
দুবলার চর মূলত জেলে গ্রাম। এ স্থানে মাছ ধরার সঙ্গে সঙ্গে চলে শুঁটকি শুকানোর কাজ। বর্ষা মৌসুমে ইলিশ শিকারের পর বহু জেলে চার মাসের জন্য সুদূর কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে ডেরা বেঁধে সাময়িক বসতি গড়ে তোলে এ স্থানে। মেহের আলীর খাল, আলোর কোল, মাঝের চর, অফিস কেল্লা, নারিকেল বাড়িয়া, মানিকখালী, ছাফরাখালী ও শ্যালার চর ইত্যাদি এলাকায় জেলে পল্লী স্থাপিত হয়। এই চার মাস তারা মাছকে শুঁটকি বানাতে ব্যস্ত থাকেন। এ স্থান থেকে আহরিত শুঁটকি চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের পাইকারী বাজারে মজুদ ও বিক্রয় করা হয়। সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের সদর দপ্তর বাগেরহাট থেকে মাছ সংগ্রহের পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে জেলেরা দুবলার চরে প্রবেশ করে থাকেন। দুবলার চর থেকে সরকার নিয়মিত হারে রাজস্ব আদায় করেন। জেলেরা আহরিত শুঁটকি মাছ পরিমাপ করে নিয়ে ফিরে আসার সময় মাছভেদে প্রদান করেন নির্ধারিত রাজস্ব।

পাখির উড়ে বেড়াবার চিত্র
অসংখ্য পাখির দেখা পাওয়া যায় দুবলার চরে। পাখিরা ডানা মেলে নির্বিঘ্নে উড়ে চলে এ দুবলার চরের উপর। নানা রংয়ের, নানা প্রজাতির সেসব পাখির ডাকে মুখরিত হয়ে থাকে দুবলার চর।
সাধারণত পাখিরা পোকামাকড়ের পাশাপাশি ছোট ছোট মাছ খেয়ে থাকে। আর সে কারণেই দুবলার চরে এত পাখির দেখা পাওয়া যায়। শুধু শীতকাল নয়, এ স্থানে নানা রকম পাখির দেখা পাওয়া যায় সারা বছর জুড়েই। বিশেষ করে যেসব পাখিরা মাছ খেতে ভালোবাসে সেসব পাখির দেখা পাওয়া যায় বেশি। আর সেসব পাখির মধ্যে অন্যতম লাল বুক মাছরাঙা ও মদনটাক পাখি।

হরিণের ছুটে চলা
খুব বেশি পশুর বাস নয় দুবলার চরে। বাঘ, কুমির, শেয়াল, কাঠবিড়ালি ইত্যাদি খুব অল্প সংখ্যক পশু রয়েছে দুবলার চরের গাছপালা ঘেরা স্থানে। দুবলার চরে যেসব পশুর দেখা পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম হরিণ। মূলত হরিণের দেখা পাওয়া যায় বলেই জায়গাটি অনেক বেশি জনপ্রিয়। এ স্থানে অবাধে ছুটে চলে হরিণের দল। গাছপালা ঘেরা জায়গাগুলোতে হরিণেরা বাস করে। প্রায়ই দেখা যায় হরিণদের ছুটে বেড়াতে, কচি পাতা খেতে। পূর্বে এ স্থানে হরিণের পরিমাণ আরো অনেক বেশি ছিল। দিনে দিনে কমে আসছে দুবলার চরের হরিণের পরিমাণ।

ভিন্ন এক সংগ্রামী জীবন-যাপন
আলোর কোল, কোকিলমনি, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝের কিল্লা, অফিস কিল্লা, নারকেল বাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া, মেহের আলির চর এবং শেলার চর নিয়ে দুবলার চর গঠিত। মোট ৮১ বর্গমাইল আয়তনের এই চর জুড়ে রয়েছে ভিন্ন এক জীবন ব্যবস্থার চিত্র। এখানকার মানুষেরা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি সংগ্রামী হয়ে থাকেন। তারা প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকেন এ স্থানে। বনদস্যুদের উৎপাত, খাবার পানির অভাব, স্বাস্থ্য সেবা সংকট, বাঘ ও কুমিরের আক্রমণ, নিম্ন মজুরি ইত্যাদি প্রায় প্রতি মৌসুমের নৈমিত্তিক ঘটনা। এছাড়া বড়সড় ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছাসে বিপর্যস্ত হয় দুবলার চরের জেলে পল্লী। এ স্থানটি ভ্রমণকালে ভিন্ন এক সংগ্রামী জীবন যাপনের উপলব্ধি করতে পারবেন কাছ থেকে।

বিখ্যাত রাসমেলা
প্রতি বছর কার্তিক মাসে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রাসমেলা এবং পূণ্যস্নানের জন্য দ্বীপটি বিখ্যাত। স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, ২০০ বছর ধরে এ রাসমেলা হয়ে চলেছে। অনেকের মতে, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে হরিচাঁদ ঠাকুরের এক বনবাসী ভক্ত, নাম হরিভজন এই মেলা চালু করেন। প্রতিবছর অসংখ্য পুণ্যার্থী রাসপূর্ণিমাকে উপলক্ষ করে এ স্থানে সমুদ্রস্নান করতে আসেন। দুবলার চরে সূর্যোদয় দেখে ভক্তরা সমুদ্রের জলে ফল ভাসিয়ে দেন। কেউবা আবার বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ভজন-কীর্তন গেয়ে মুখরিত করেন চারপাশ। দুবলার চরের রাসমেলায় স্থানীয় লোকজন ছাড়াও দূর-দূরান্তের শহরবাসী এমনকি বিদেশি পর্যটকেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে থাকেন। তিন দিনব্যাপী চলে এই মেলা।

দুবলার চরে যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে প্রথমে বাগেরহাটের মংলা পোর্টে যেতে হবে। ঢাকার সায়েদাবাদ, জনপথ মোড় থেকে বিভিন্ন সময় বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। খুলনা হয়েও যেতে পারেন। ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে এসি বাসে যেতে চাইলে (সরাসরি বাগেরহাটের এসি বাস পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে খুলনা হয়ে যেতে হবে)। ঢাকা থেকে মংলা পৌঁছে, সেখান থেকে ট্রলার কিংবা লঞ্চ ভাড়া করে যেতে হবে দুবলার চরে। সময় লাগবে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। খুলনা শহরের লঞ্চঘাট থেকেও লঞ্চ ভাড়া করে যেতে পারবেন দুবলার চরে।

সম্পর্কিত পোস্ট