দেশের ৭০ ভাগের বেশি জনগণ করোনায় আক্রান্ত

270
ছবি: সংগৃহীত

করোনাভাইরাস আটটি মানব সংক্রমণকারী রেস্পিরেটরি ভাইরাসের মধ্যে একটি নতুন সদস্য ভাইরাস। এ ভাইরাসটির ক্ষেত্রে যা বিবেচ্য তা হল এটি সদ্যজাত এবং অন্যান্য রেস্পিরেটরি ভাইরাস থেকে একটু ব্যাতিক্রমধর্মী।

এটির যে দুটি বিষয় লক্ষণীয় তাহল এর রিপ্রোডাকশন নাম্বার (Reproduction Number, R)-এর স্বল্পতা যা অন্যান্য রেস্পিরেটরি ভাইরাসের তুলনায় আপেক্ষিকভাবে কম এবং তাসত্ত্বেও এর তীব্র ট্রান্সমিশন প্রবেবিলিটি (Transmission Probability, Tp)। অন্যটি হল এর ব্যাপক বিস্তারের স্বার্থে কমিউনিটিতে ব্যাপক প্রতিরোধ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়া বা হার্ডইমিউনিটি (Herd Immunity) তৈরি হওয়া।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিনে বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় রিপ্রোডাকশন নাম্বার (R) হচ্ছে একজন রোগী হতে ইনফেকশনটি কতজনে ছড়াতে সক্ষম তা এর সোজাসাপটা গণিত।

সাধারণত কিছু রেস্পিরেটোরি ভাইরাস যেমন মিজেলস (Measles)-এর ক্ষেত্রে এটি অস্বাভাবিকভাবে বেশি আর তাই মিজেলস অন্য সব ড্রপলেটবাহী রোগের চেয়ে বেশি লোকে আক্রান্ত করতে পারে যার দরুন তাকে অন্যদের তুলনায় অধিক সংক্রামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বিশ্বব্যাপী ২০০২ সালে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সার্স (SARS) নামক ভাইরাসের R ছিল ২.৬। লন্ডনভিত্তিক সাম্প্রতিক গবেষণায় COVID-19 (এটিও এক প্রকার সার্স ভাইরাস, SARS-CoV-2)-এর R৩-৪ বলে তথ্য উধঘাটিত হয়। এটির R খুব বেশি না হওয়া সত্ত্বেও এর Tp এত বেশি কেন? এ প্রকার প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক। এ প্রকার একটি জিজ্ঞাসা নিপসম বিগত ৮ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-স্বাস্থ্য অধিদফতর-ডিজিএমই-আইইডিসিয়ার-নিপসমের যৌথ ভিডিও কনফারেন্স-এ সাংহাই-এর প্রফেসর ঝাঙ ওয়েন হং (যিনি চীনের ওহান থেকে সাংহাইকে সংক্রমিত না হতে প্রধান ভুমিকা পালন করেছেন)-কে করলে তিনি জানান, যদিও এটি সার্স-এর সমগোত্রীয় ভাইরাস তথাপিও এর R অপেক্ষাকৃত কম, তথাপিও এর ব্যাপকতা বেশি হওয়ার কারণ এটি হতে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে এর সুপ্ত থাকার ক্ষমতা (Incubation period) যা নিদেনপক্ষে ৭ দিন বা ০১ থেকে সর্বাধিক ১৪ দিন।

অন্যান্য রেস্পিরেটরি ভাইরাসের ক্ষেত্রে এটি সাধারণতঃ ২-৭ দিন হয়ে থাকে। এটি ছাড়া এর এসিম্পটোমেটিক (Asymptomatic) বা সুপ্তাবস্থায় রোগ অন্যে সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা। এ সবই এর বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার অন্যত্তম কারণ। এটি আক্রান্তের দেহে অনেক দিন কোনো প্রকার লক্ষণ প্রকাশ ব্যতীত বা সুপ্তাবস্থায় থেকে এক থেকে অন্যে ছড়াতে পারে। এ ছাড়া এ ভাইরাসের রোগীর মৃত্যু ঘটানোর ক্ষমতা শতকরা ২-৩ ভাগ যা অবশ্যই এটিকে ভয়াবহ হতে নিশ্চিত করে।

প্রফেসর ঝাঙ ওয়েন হং জানান, ওহানে এর সুপ্তাবস্থায় রোগ অন্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারদর্শিতা ছিল শতকরা ৩৬-৩৮ ভাগ। সম্প্রতি আমেরিকায় এটি ১০ থেকে ২০ ভাগ বেশি মৃত্যু ঘটানোর ক্ষমতা নিয়ে আক্রমণ করেছে যা অনভিপ্রেত।

আমাদের দেশের COVID-19-এর প্রথম ০৩ জন রোগী শনাক্ত হয় বিগত ০৮ মার্চ ঠিক ঐ সময় সমগ্র আমেরিকার মধ্যে শুধু ওয়াশিংটন আক্রান্ত ছিল। রোগাক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৮ (০১টি মৃত্যুসহ)। আমাদের এমনিতেই রোগ শনাক্তকরণ ক্ষমতা তাদের চেয়ে ছিল অনেক অনেক কম। তাদের মতো করে ব্যাপক আকারে রোগ নির্ণয় করা গেলে হয়তো তা হতো তাদের চেয়ে অনেক বেশি।

আমরা তাদের মতো করে এটিকে প্রতিরোধ করতেও ছিলাম প্রায় অসমর্থ। আমরা অবাধে সমগ্র মার্চব্যাপী এ রোগটিকে দেশে বয়ে এনেছি। আমেরিকা এর সঙ্গে রোগের ব্যাপকতা তুলনা করছি যেন এটির সংক্রমণ আচরণ বুঝতে সহজতর হয়। যাই হউক আমেরিকা রোগের হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে এ ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই সফল।

আমরা COVID-19-এর ক্ষেত্রে সম্প্রতি এক নির্ভরযোগ্য স্টাডি থেকে (Zhao J et al. Clin Infect Dis. 2020 March 28) সংক্রমিত হওয়ার পর দেহে সৃষ্ট প্রতিরোধ তৈরি সংক্রান্ত যে তথ্য পেয়েছি তা হল এটিতে কেউ আক্রান্ত হওয়ার পর ০১ থেকে ০৭ দিনে শতকরা ৩৮ ভাগ আর ১৫ থেকে ৩৯ দিনে শতকরা ১০০ ভাগ ইমিউন (Immune) ক্ষমতা তৈরি করে।

তাছাড়া যদি আমাদের দেশে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার তথ্যই খেয়াল করি, বিগত ০৮ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সর্বমোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭৮ জন, কোয়ারেন্টিনে গিয়েছেন ৭২,২৮৪ জন যার ৫৯,৬৮১ জন কোয়ারেন্টিন থেকে মুক্ত হয়েছেন আর আইসোলেশনে গেছেন ৪৭৩, আইসোলেশন সম্পন্ন করেছেন ৩৩৬ জন এবং সর্বমোট মৃত্যু ৩০ জন। আর অন্যদিকে আমেরিকাতে এর প্রকোপ ভয়াবহ।

এ রোগে আমাদের আক্রান্ত হওয়ার হার মাত্রাতিরিক্ত (টেস্ট করার ক্ষমতা কম তাই আক্রান্তের সংখ্যাও কম) হলেও মৃত্যু হারও অন্যদের তুলনায় অনেক অনেক কম। আমরা ইতিমধ্যেই ভাইরাস কন্টেইনমেন্টের সব নিয়ম ভংগ করেছি আর এর দরুন এটির বিস্তার আজ দেশে ঢাকা সহসর্বত্র।

তুলনামূলক মৃত্যু হার এরূপ হওয়ার কারণ কী হতে পারে? স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে। উত্তরটি হচ্ছে সম্ভবতঃ ইতিমধ্যে আমরা হয়তো ৭০ ভাগের বেশি জনগণ ইতিমধ্যেই এতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। কেউকে এর লক্ষণ প্রকাশ করতে পারছি কেউ পারছি না, শনাক্ত হচ্ছি কেউ, কেউ হচ্ছি না তাছাড়া আমাদের পপুলেশন পিরামিড লক্ষ্য করলে এর আরও কারণ দৃশ্যমান হবে বলে মনে করি।

বিগত ১১ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যার তথ্য মতে, তাদের ৬টি রিজিওনের আক্রান্ত সব দেশের মধ্যে ২৪টি দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটেছে, ৫০টি দেশে স্পোরাডিক সংক্রমণ ঘটেছে, ক্লাস্টার সংক্রমণ ঘটেছে ৭১টি দেশে আর তথ্য পাওয়া যায়নি অবশিষ্ট দেশগুলো থেকে।

দক্ষিণ-পূর্ব রিজিওনে এটি ০৩টি দেশে স্পোরাডিক আর ক্লাস্টার সংক্রমণ ঘটেছে ০৭টি দেশে আর আমাদের দেশ এ ক্লাস্টার সংক্রমণের আওতায় রয়েছে বলে তারা নিয়মিত সার্ভিলেন্সের অনশ হিসেবে রিপোর্ট করেছে। অন্যান্য দেশ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া এ যাবৎ টেস্টসম্পন্ন করেছে ০৫ লাখ পরীক্ষা। আর আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত করেছে প্রায় ১.৪ লাখেরও বেশি।

এ ক্ষেত্রে বলা যায়, আমাদের যদি আরও বেশি পরীক্ষা করার ক্ষমতা থাকতো তবে অবশ্যই আমেরিকার মতো রোগটি কমিওনিটি ট্রান্সমিশন প্রদর্শন করত। আমরা যদি এ ক্ষেত্রে ভারতকে তুলনা করি তাদের এত টেস্টের পরও কেন স্পোরাডিক সংক্রমণ বলা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে বলা যায় তাদের ভাইরাস কন্টেইনমেন্ট ছিল আমাদের চেয়েও শক্ত পোক্ত। যদিও তাদের কোনো কোনো প্রদেশে মহামারীর প্রথম ধাপ থেকে দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার প্রক্রিয়া আমাদের মতোই ছিল।

আমরা ইতিমধ্যে COVID-19- এর ব্যাপক আমদানি করে এবং ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়ে আমাদের কমিউনিটিতে হার্ড ইমিউনিটি ডেভেলপ করে ফেলেছি প্রায়। আর এটি ত্বরান্বিত করতেই প্রয়োজন আরও ট্রান্সমিশন যা নিশ্চিত করবে সফল হার্ড ইমিউনিটি। এটি পরীক্ষামূলক এক স্টাডি করে এক্ষণে প্রমাণ করা যেতে পারে।

চলমান মলিকিউলার টেস্টের পাশাপাশি র‍্যাপিড টেস্ট চালু করে দেখা যেতে পারে কমিউনিটিতে হার্ড ইমিউনিটির স্ট্যাটাস। যে সব মলিকিউলার টেস্ট নেগেটিভ আসবে তাদের নিয়েই এ স্টাডি শুরু করা যাতে পারে।

প্রমাণ হয়ে যাবে হার্ড ইমিউনিটি ডেভেলপ করতে আমরা আর কত দূরে আর এ থেকেই প্ল্যান করা যাবে ঢাকায় লকডাউন কী প্রক্রিয়ায় তুলে নেয়া যাবে এবং তৎপরবর্তী অন্যান্য জেলাগুলাতেও কি প্রক্রিয়ায় এর বাস্তবায়ন হবে।

লেখক: ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন
ভাইরাসবিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নিপসম, মহাখালী, ঢাকা।
mohammadjamaluddin_1980@yahoo,com