জামায় হাত ঢুকিয়ে বক্ষে চাপ দেন তিনি: প্রিয়তি

104

তনুশ্রী দত্তের হাত ধরে ‘মি টু’ মুভমেন্ট যখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল বলিউডে, তখন খুব আগ্রহভরে অপেক্ষা করছিলাম, কবে কোন একজন বাংলাদেশী নারী সাহস করে কোন নিপীড়কের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারবেন যৌন হয়রানির অভিযোগের কথা, সমাজ কিংবা ফালতু লোকলজ্জার কথা ভুলে গিয়ে বলতে পারবেন তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় আচরণটির কথা। দেরীতে হলেও এদেশের কেউ একজন মুখ খুলেছেন, বুকভর্তি সাহস নিয়ে সরাসরি আঙুল তুলেছেন কারো দিকে। সাহসী এই নারীর নাম মাকসুদা আখতার প্রিয়তি।

প্রিয়তিকে যারা চেনেন না, তাদের জানিয়ে রাখি, আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত এই প্রবাসী মডেল সেখানকার সাবেক মিজ আয়ারল্যান্ডের খেতাবজয়ী। ২০১৪ সালে ৭০০ প্রতিযোগীকে হারিয়ে ‘মিজ আয়ারল্যান্ড’ নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের মেয়ে প্রিয়তি। শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া মহাদেশ থেকে এই প্রতিযোগিতায় একমাত্র প্রতিযোগী ছিলেন তিনি।

ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে প্রিয়তি জানিয়েছেন তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার কথা। যার দিকে অভিযোগের আঙুল, তার নাম রফিকুল ইসলাম রফিক। তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান। একইসঙ্গে তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও। তাকে ‘প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী’ উল্লেখ করে প্রিয়তি লিখেছেন- ‘এই লোকটির নাম রফিকুল ইসলাম, রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং বসুন্ধরা গ্রুপের ডান হাত। এই পোস্টের পর হয়তো আমার নামে মানহানির মামলা হবে, না হয় বলবে অসৎ উদ্দেশ্য আছে আমার ইত্যাদি ইত্যাদি।’

কি হয়েছিল প্রিয়তির সাথে? রগরগে বর্ণনায় না গিয়ে তার ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকেই ছোট্ট একটা অংশ তুলে ধরছি। ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রিয়তি লিখেছেন- ‘এই লোকটি তার অফিসে হঠাৎ করে টেবিল থেকে উঠে এসে আমার জামার ভিতর হাত ঢুকিয়ে আমার বক্ষে চাপ দেয়, ২০১৫ সালের মে মাসে তাদের প্রোডাক্ট প্রমেক্স এর বিজ্ঞাপন এর পেমেন্ট আনতে গিয়ে (এই পেমেন্ট যদিও আমি পাইনি)। আমি চিৎকার করে কান্না করেছিলাম এই অপমান সহ্য করতে না পেরে, কিন্তু আমরা পুরোপুরি নিরুপায় ছিলাম তাদের ক্ষমতার কাছে। আমি কিন্তু তখন কারেন্ট মিস আয়ারল্যান্ড ছিলাম।’

প্রিয়তি আরও জানিয়েছেন, ‘আমি শুধু এতটুকু বলতে চাই, পুরো ঘটনাটি লজ্জায় লিখতে পারিনি কারণ ঘটনা এর চেয়ে ভয়াবহ ছিল।’ সেইসঙ্গে তিনি আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন এই বলে, ‘এই লোককে নিয়ে কেউ কোন নিউজ করবে না, কারণ গণমাধ্যম তাদের ভয় পায়, সাংবাদিক দের চাকরি চলে যাবে। কারণ বেশীরভাগ টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা তাদের হাতের মুঠোয়। কিভাবে খুলবে মেয়েরা মুখ? যেখানে জানবে যে তাদের (নিপীড়কদের) কিছুই হবে না। বাংলাদেশের মেয়েরা ততদিন মুখ খুলবে না, #মি_টু ও হবে না, ভারতের মতো যতদিন ওরা অনুভব করবে তাদের জন্য বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্বাধীন এবং তাদের পাশে থাকবে সে যত উপরের মানুষ ই হোক না কেন।’

প্রিয়তিকে ধন্যবাদ। যে সাহসটা অন্য কেউ দেখাতে পারেননি, সেটা তিনি দেখিয়েছেন, অবিশ্বাস্য একটা কাজ করেছেন তিনি। এর আগেও আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এমন অভিযোগ এসেছে কয়েকবার, কিন্ত কেউ পাত্তা দেয়নি সেসবে। সবচেয়ে বড় কথা, স্পষ্ট করে কেউ কখনও নিপীড়কের নাম উল্লেখ করে বলতে পারেনি, সেটা নিরাপত্তার জন্যেই হোক, কিংবা অন্য কোন কারণে। সেটা প্রিয়তি করেছেন। অনেকেই হয়তো বলবেন, আয়ারল্যান্ডে বসে এরকম আঙুল তুলে বলাই যায়। সেসব নিয়ে তর্কে যাবো না। প্রিয়তির দুঃসাহসিকতা এসব কথায় ম্লান হবে না একটুও।

আমাদের মিডিয়ায়, বা আমাদের দেশের অনেক সেক্টরেই নারী নির্যাতন, নারীদের যৌন হয়রানীর ব্যাপারটা অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। কিন্ত কেউ এগুলো নিয়ে কথা বলতে চায় না, অনেকে হয়তো কথা বলার সাহসটাও পান না। কারণ অভিযোগ তুললে উল্টো নারীর ঘাড়েই দোষ দেবে পুরুষশাসিত এই সমাজ, নারীকে ভোগ্যপণ্য ভাবতে পছন্দ করা লোকগুলো মেয়েটিকেই চরিত্রহীনা বানিয়ে ছাড়বে শেষমেশ।

এমনকি এই জায়গাটায় নারী নিজেও নিজের প্রতিপক্ষ! গতবছর মডেল-অভিনেত্রী ফারিয়া শাহরিন যখন যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন, তখন মিডিয়াতে কাজ করা সিনিয়র অভিনেত্রীদের কেউ কেউই তাকে নিয়ে ‘ফেমসিকার’ বা আরও আজেবাজে কথা বলেছিলেন, তার তোলা অভিযোগটা তলিয়ে দেখতে যাননি কখনও। এবারও তেমন কিছু হলে অবাক হবো না একটুও।

প্রিয়তি আরও বলেছেন, ‘বিচারের আশা তিনি করেন না। ফেসবুকে দেয়া পোস্টের কমেন্টবক্সে তিনি লিখেছেন, “আমি জানি আমার এই জার্নি এই ফেসবুক এর পোস্ট পর্যন্ত ই , আমাকে স্যালুট আর বাহবা দেয়া পর্যন্তই, এই নিয়ে আমার পাশে ঐ কুশক্তিশালীদলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়াবে না। কেউ টু শব্দ ও করবে না।’ প্রিয়তির আশঙ্কাটা অমূলক নয় মোটেও। ক্ষমতা আর টাকার কাছে পোষ মানার নজির তো এদেশে কম নেই!

জামার ভিতর হাত ঢুকিয়ে আমার বক্ষে চাপ দেয়

‘লোকটি আমার জামার ভিতর হাত ঢুকিয়ে বক্ষে চাপ দেয়। চিৎকার করে কান্না করেছিলাম অপমান সহ্য করতে না পেরে, কিন্তু নিরুপায় ছিলাম…' Maksuda Akhter Prioty।। বিনোদন জগতের খবর পেতে পেজে লাইক দিন ।।

Posted by BDHeadline.com on Tuesday, October 30, 2018