Home » ঘুরে আসুন কুমিল্লার শালবন বিহার

ঘুরে আসুন কুমিল্লার শালবন বিহার

কর্তৃক BDHeadline

কুমিল্লায় বেড়াতে এলে প্রথমেই যে জায়গাটা দেখতে যাওয়া হয়, সেটা শালবন বিহার। চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা কাছে বলে স্কুল-কলেজগুলো পিকনিকে আনে এই শালবন ওরফে ময়নামতি বিহারে। ক্লাস নাইনে পড়াকালীন সময়ে প্রথম এসেছিলাম স্কুলের শিক্ষাসফরে। এরপর আরোও কয়েকবার আসা হয়েছিল। কিন্তু পুরাকীর্তির প্রতি টান থাকায় আবারো এলাম।

টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম শালবন বিহারে। প্রথমেই যেটা চোখে পড়ল, চমৎকারভাবে সাজানো ফুলের উদ্যান। চেনা-অচেনা নানা ধরনের ফুলের গাছ। পুরো বৌদ্ধবিহারের মধ্যে রয়েছে হরেক রকমের ফুল- কসমস, ডালিয়া, জিনিয়া, মৌচান্দা, সেলভিয়া, বোতাম, গোলাপ, সিলভিয়া, কেলানডোলা ইত্যাদি। বছরজুড়ে ঋতুভিত্তিক নানা প্রজাতির ফুলের গাছও লাগানো হয়।

উবু হয়ে বসে হাত বাড়িয়ে পাতার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া দোপাটি ফুল ছুঁয়ে দেখতে যাচ্ছিলাম, তাই দেখে তাসনু বলল, ‘আপুনা এভাবেই থাকো, একটা ছবি তুলে নেই’।

একটু এগুতেই দেখি, একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুর গাছে বাবুই পাখির বাসা ঝুলছে। তা দেখে বিখ্যাত একটা কবিতা মনে পড়ে গেলো। বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই …

বাউন্ডারি টাইপ উঁচু স্থাপনা ঘুরে বোদ্ধ বিহারে প্রবেশ করলাম। ঘুরে ঘুরে দেখছি। লালমাই পাহাড় এলাকায় বিহারটির আশপাশে একসময় শাল-গজারির ঘন বন ছিল। এখনো অবশ্য শাল-গজারির বন আছে, তবে আগের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। এই শালবনের আধিক্যের কারণেই বিহারটির নাম দেওয়া হয় শালবন বিহার। খননে প্রাপ্ত একটি পোড়ামাটির নিদর্শন থেকে জানা যায়, দেব বংশের চতুর্থ রাজা শ্রী ভবদেব খ্রিষ্টীয় আট শতকে এ বিহার নির্মাণ করেন। তখন বিহারটির নাম ছিল ভবদেব মহাবিহার।

শালবন বিহারের মধ্যভাগে একটি মন্দির ও উত্তর বাহুর মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে নান্দনিক ও কারুকার্যময় প্রবেশ তোরণ। নান্দনিক সেই তোরণটি দেখে বললাম, ‘এই গেটকে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করলো, এতোটা অক্ষত রয়েছে কী করে?’ ওরা বললো, ‘এটা মোটেও এভাবে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করেনি। করলে এতটা অক্ষত আর নিখুঁত হতে পারতো না।’
তবে? এটা নকল?
জানা নেই কারোর। চুপ মেরে গেল সবাই।

এই বোদ্ধবিহারের সবচেয়ে উঁচু স্থাপনার কাছে গেলাম। এখান থেকে পুরো জায়গাটাকে খুব ভালোমতো দেখা যায়। ঘুরে ঘুরে দেখছি। হালকা পায়ে পোড়ামাটির ফলকের উপর দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ পা হড়কালো। কী করে যে টাল সামলাম, জানি না! পড়লে আর দেখতে হতো না!

উঁচু হওয়ায় ঝিরঝিরে হালকা বাতাস বইছিল। ওখানেই হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়লো সবাই। শিহান বাড়ি থেকে হাতে বানানো নারকেলের নাড়ু নিয়ে এসেছে। সবাই মিলে খেতে শুরু করলাম। বাচ্চাকালের চড়ুইভাতি চড়ুইভাতি ফ্লেভারটা তখন আরেকবার পেলাম।

এরপরের স্থাপনাটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে। আর পুরো জায়গাটার ঠিক মাঝখানে কিছু শ্রমিক কাজ করছে। ওদের দিকে তাকিয়ে সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, এটা ঠিক এভাবেই মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয়েছিল?’

রূদ্র খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটা পরীক্ষা করতে করতে বললো, ‘না। সে আমলে নিশ্চয়ই ইটের গায়ে ইংরেজি লেখা থাকতো না?’

হতভম্ব হয়ে ওর দেখানো ইটের সারির দিকে আঙুল তাক করলো। ‘তাহলে পুরোটাই পরে তৈরি করা?’ হাহাকার কিছুতেই চেপে রাখতে পারছিলাম না। ‘এত বড় ফাঁকিবাজি!’

জাকির ভাইয়া হেসে ফেলল। বললো, ‘মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করার সময় ভেঙে গিয়েছিল না? ওটাকে ওভাবেই আবার পুনঃস্থাপন করেছে।’

পোড়ামাটির ফলকগুলো দেখিয়ে বলল, ‘এগুলো নকল না।’

প্রত্নসম্পদে ভরপুর কোটবাড়ী এলাকার শালবন বৌদ্ধবিহারের প্রথম খননকাজ ১৯৫৫ সালে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত খনন করে শালবন বৌদ্ধবিহারের মূল মন্দিরকে ঘিরে চারপাশে ছোট ছোট নয়টি মন্দির ও ছয়টি স্তূপ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মূল মন্দিরের বাইরে আরও দুটি মন্দির ও চারটি স্তূপ আবিষ্কৃত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের পহেলা নভেম্বর থেকে মূল বৌদ্ধবিহারের (মন্দিরের) উত্তর-পূর্ব কোণে পাঁচ বর্গমিটার আয়তনের ২১টি বর্গাকৃতি স্থানে খননকাজ শুরু করা হয়। একই বছর ৩০ নভেম্বর সেখানকার একটি স্থানে ইট ও কাদামাটির তৈরি কূপের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন গোলাকার কূপটির ব্যাসার্ধ ১১ ফুট চার ইঞ্চি।

উপর থেকেই আমরা কুয়াটি দেখতে পেলাম। রেলিং দেওয়া। রেলিংয়ের বাইরে দেখে মনে হলো অনেক গভীর। সেই ভয়েই বুঝি রেলিং দেওয়া। জাকির ভাইয়া গভীরতার তোয়াক্কা না করে রেলিং টপকে ওপাশে গিয়ে কুয়া মুখে উঁকি দিল। এরপর হাসতে হাসতে বলল, ‘বাইরে থেকে দেখছিস, সেটাই ভালো। অন্তত এটা তো ভেবে নিতে পারছিস যে কুয়াটা অনেএএএএক গভীর!’
আমি আর জাকির ভাইয়াকে বলিনি, ভেতর থেকে ছবি তুলতে। বাইরেরটাই দেখি নাহয়!

সাইনবোর্ডে বিহারের ইতিহাসটা লেখা আছে। শালবন বৌদ্ধ বিহার বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি প্রত্নস্থলের অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনাগুলোর একটি এই বৌদ্ধ বিহার। এতে সপ্তম-দ্বাদশ শতকের প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়।

ধারণা করা হয় যে, খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। শালবন বিহারের ছয়টি নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ পর্বের কথা জানা যায়। খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে তৃতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় মন্দিরটি নির্মাণ করা হয় ও বিহারটির সার্বিক সংস্কার হয় বলে অনুমান করা হয়। চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায়ের নির্মাণকাজ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয় নবম-দশম শতাব্দীতে।

আকারে এটি চৌকো। শালবন বিহারের প্রতিটি বাহু ১৬৭.৭ মিটার দীর্ঘ। বিহারের চার দিকের দেয়াল পাঁচ মিটার পুরু। কক্ষগুলো বিহারের চারদিকের বেষ্টনী দেয়াল পিঠ করে নির্মিত। বিহারে ঢোকা বা বের হওয়ার মাত্র একটাই পথ ছিল। এ পথ বা দরজাটি উত্তর ব্লকের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের মাঝে ১.৫ মিটার চওড়া দেয়াল রয়েছে। বিহার অঙ্গনের ঠিক মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় মন্দির।

বিহারে সর্বমোট ১৫৫টি কক্ষ আছে। কক্ষের সামনে ৮.৫ ফুট চওড়া টানা বারান্দা ও তার শেষ প্রান্তে রয়েছে অনুচ্চ দেয়াল। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে তিনটি করে কুলুঙ্গি রয়েছে। কুলুঙ্গিতে দেবদেবী, তেলের প্রদীপ ইত্যাদি রাখা হতো। এই কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থাকতেন। সেখানে বিদ্যাশিক্ষা ও ধর্মচর্চা করতেন।

বিহারের বাইরে প্রবেশ দ্বারের পাশে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি হলঘর রয়েছে। চার দিকে দেয়াল ও সামনে চারটি বিশাল গোলাকার স্তম্ভের ওপর নির্মিত সে হলঘরটি ভিক্ষুদের খাবার ঘর ছিল বলে ধারণা করা হয়। হলঘরের মাপ ১০ মিটার*২০ মিটার। হলঘরের চারদিকে ইটের চওড়া রাস্তা রয়েছে। শালবন বৌদ্ধবিহারের আয়তন ৩৭ একর। অমূল্য প্রত্নসম্পদে সমৃদ্ধ স্থানটি আগে শালবন রাজার বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু সেখানে ১৯৫৫ সালে খননের পর ৫৫০ ফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত একটি বৌদ্ধবিহারের ভূমি নকশা উন্মোচিত হয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিহারটির ধ্বংসাবশেষ থেকে আটটি তাম্রলিপি, প্রায় ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়া মাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে।

কুমিল্লার কোটবাড়ির ময়নামতি জাদুঘরের কাছেই শালবন বৌদ্ধবিহার। এ বিহার থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ প্রত্নসম্পদ ময়নামতি জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।

অষ্টম শতকে নির্মিত এই প্রত্নসম্পদের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে শত শত পর্যটক প্রতিদিন ভিড় করেন। বছরে ১-১.৫ লাখ দেশি এবং ৫০০-৬০০ জন বিদেশি পর্যটক আসেন। শীতের এ মৌসুমে দর্শনার্থী সমাগম বাড়ে। এসব পর্যটকের কাছ থেকে টিকিট বিক্রি বাবদ প্রতিবছর শালবন বিহার থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয় ৩০-৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রকাশনা বিক্রি ও গাড়ি পার্কিং বাবদ আরও ৭০-৭৫ হাজার টাকা আয় হয়। এতে দেশি পর্যটকদের প্রবেশ ফি জনপ্রতি ২০ টাকা, সার্কভুক্ত আটটি দেশের পর্যটকদের জন্য ১০০ টাকা এবং অন্যান্য দেশের জন্য ২০০ টাকা হারে নির্ধারিত রয়েছে।

শালবন বিহার ছাড়াও কুমিল্লার লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়কে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য প্রত্নসম্পদ। এসবের মধ্যে রূপবান মুড়া, কোটালিমুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দবিহার, ভোজবিহার, রানীর বাংলো প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব প্রত্নসম্পদ পর্যটকদের এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও ইতিহাসের কথা জানান দিচ্ছে। প্রাচীনকাল থেকে কুমিল্লা অঞ্চল শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকলা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ।

যাবেন যেভাবে
কুমিল্লা শহর হতে ট্যাক্সি যোগে যাওয়া যায়। কুমিল্লা সেনানিবাস বাসট্যান্ড হতে ট্যাক্সি, বাস, রিক্সা যোগে যাওয়া যায়।

সম্পর্কিত পোস্ট