আশ্চর্য সুন্দর জলপ্রপাত ‘নাফাখুম’

14

রেমাক্রি থেকে তিন ঘন্টার পায়ে হাঁটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাবেন অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে একটি জলপ্রপাতের কাছে। কাছে গিয়ে জলপ্রপাতের সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখে মনে হবে যেন স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু না, দেখছেন বাস্তবে। জলপ্রপাতটির নাম ‘নাফাখুম’। রেমাক্রি খালের পানি প্রবাহ এই নাফাখুমে এসে বাঁক খেয়ে নেমে গেছে প্রায় ২৫-৩০ ফুট….প্রকৃতির খেয়ালে সৃষ্টি হয়েছে চমৎকার এক জলপ্রপাত! আর তা দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার প্রকৃতিপ্রেমী ছুটে আসেন এখানে।

সূর্যের আলো নিয়ে যেখানে নিত্যদিনের খেলা সেখানে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারবেন নতুন করে। প্রকৃতির সাথে মিশে আপনিও হয়ে উঠবেন বর্ণিল রংধনুর খেলার সাথি! ভরা বর্ষায় রেমাক্রি খালের জলপ্রবাহ নিতান্ত কম নয়… প্রায় যেন উজানের সাঙ্গু নদীর মতই।

নাফাখুমের পড়ন্ত জলের ধারা দেখে এর নিচে গিয়ে বসতে মন চাইবে আপনার। সে ইচ্ছাও পূরণ হবে আপনার। কারন নিচে বসার সুযোগ আছে। তবে নতুনদের জন্য বিষয়টা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অভিঙ্গ পর্যটক এবং পাহাড়ীরা সেখানে যেতে পারে সহজেই। মজার বিষয় হলো পাহাড়ীরা জলপ্রপাতের পিছনে বসে অনায়াসে মাছ শিকার করে। এক ধরনের উড়ুক্কু মাছ (স্থানীয় ভাষায় মাছটির নাম নাতিং মাছ) উজান ঠেলে এসে নাফাখুমে বাধাপ্রাপ্ত হয়, লাফ দিয়ে এই প্রপাত-টা আর ক্রস করতে পারেনা….গিয়ে পড়ে জলপ্রপাতের ভিতরে ছোট্ট একটা গুহায়। অনায়াসে সেখান থেকে মাছ সংগ্রহ করে স্থানীয় পাহাড়ীরা।

রেমাক্রি বাজার থেকে দুইভাবে নাফাখুম-এ যাওয়া যায়। এক ঘন্টা উঁচু-নীচু পাহাড়ী পথ মাড়িয়ে (পাহাড় ডিঙিয়ে) তারপর রেমাক্রি খালের পাড় ধরে বাকিটা হেঁটে চলা। এই পথে গেলে নাফাখুমে পৌঁছাতে আপনার সময় লাগবে চার ঘন্টা। রেমাক্রি খাল ক্রস করতে হবে তিন বার, যার মধ্যে শেষবার আপনাকে সাঁতার পানি পেরুতে হবে। আপনি পাহাড় না ডিঙিয়ে গোটা পথই রেমাক্রি খালের পাশ দিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে নৌকা করে রেমাক্রি খালের মুখে (যেখানে রেমাক্রি খাল সাঙ্গুতে পড়েছে, রেমাক্রিখুম) যেতে হবে আপনাকে…তারপর খালের পাড় দিয়ে হাঁটা পথে নাফাখুম বরাবর। এই পথে আপনাকে চার বার খালটি ক্রস করতে হবে…তবে সময় লাগবে তিন ঘন্টা।

আপনাকে দ্বিতীয় পথেই যেতে পরামর্শ দেব…এতে আপনার সময় ও এনার্জী দু’টোই ব্যয় হবে কম। আর শীতের দিনে গেলে খাল ক্রস করার ঝামেলাই নেই…. গোটাটাই আপনি ঝিরিপথ দিয়ে হেঁটে যেতে পারবেন। তবে শীতকালে নাফাখুম-এর এই পূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ হবেনা। পানি প্রবাহ অনেক কমে যাবে তখন।

রেমাক্রিখুম-টাও খুব সুন্দর! রেমাক্রি বাজারের কাছেই এই ‘রেমাক্রি খুম’। রেমাক্রি খাল যেখানে এসে সাঙ্গু নদীতে পড়েছে…. সেটাই রেমাক্রি খুম। পাঁচ-ছয় ফুট উপর থেকে কয়েকটি ধাপে পানি পড়ছে এই জলপ্রপাতে। এটি অনেক চওড়া। এই জলপ্রপাতটিও আপনাকে মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। তিন্দু থেকে রেমাক্রি যাবার পথেই চোখে পড়বে এই রেমাক্রিখুম।

যাবেন যেভাবে
ঢাকা থেকে বান্দরবান। তারপর বান্দরবান শহর থেকে থানচি উপজেলা (বান্দরবান জেলার সর্বদক্ষিণের উপজেলা) সদরের দূরত্ব ৮২ কিঃমিঃ। রিজার্ভ চাঁদের গাড়ীতে বান্দরবান থেকে থানচি যেতে সময় লাগবে ৩ ঘন্টা, ভাড়া নেবে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। পথে চিম্বুক আর নীলগিরিতে নেমে কিছু ছবি তোলার ইচ্ছে থাকলে সময় কিছুটা বেশী লেগে যেতে পারে।

বর্ষায় ইঞ্জিনবোটে থানচি থেকে তিন্দু যেতে সময় লাগবে আড়াই ঘন্টা। তিন্দু থেকে রেমাক্রি যেতে লাগবে আরও আড়াই ঘন্টা। এই পাঁচ ঘন্টার নৌ-পথে আপনি উজান ঠেলে উপরের দিকে উঠতে থাকবেন আর ভার্টিকেল ডিষ্টেন্স কভার করবেন প্রায় ৫০ মিটার। শীতের সময় ইঞ্জিন বোট চলার মত নদীতে যথেষ্ট গভীরতা থাকেনা। তখন ঠ্যালা নৌকাই একমাত্র বাহন। বর্ষা মৌসুমে তিন দিনের জন্য ইঞ্জিনবোটের ভাড়া পড়বে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আর শীত মৌসুমে ঠ্যালা-নৌকার ভাড়া পড়বে প্রতি দিনের জন্য ১০০০ টাকা।

থানচি থেকে যত উজানে যাবেন (দক্ষিণে)…. নদীর স্লোপ তত বাড়তে থাকবে। গোটা নদীপথেই একটা জেন্টেল স্লোপ-তো আছেই…তার উপরে মাঝে মাঝেই আছে ১ ফুট থেকে ১ মিটার পর্যন্ত খাড়া স্টেপ-আপ। আমি রেমাক্রি ছাড়িয়েও ছোট মওদক পর্যন্ত গেছি। কিন্তু তিন্দু থেকে রেমাক্রি পর্যন্ত নদীপথ-টুকুই বেশী খরস্রোতা ও একটু ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢালু পাহাড়ী নদী খরস্রোতা হওয়াই স্বভাবিক… বর্ষায় সাঙ্গুও সেইরকম খরস্রোতা। তবে ভয় পাবার কিছু নেই। নৌকার মাঝিরা যথেষ্ট দক্ষ। পর্যটকদের নিরাপদে পৌঁছে দিতে তারা অভ্যস্ত। দুই-একটা দূর্ঘটনার গল্প হয়তো শুনবেন…. কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। একটু সাবধান আর নৌকার মাঝিদের পরামর্শ মেনে চললে নিরাপদে থাকতে পারবেন। ফেরার সময় মজা একটু বেশিই। রাফটিং-এর মজা উপভোগ করতে পারবেন। মনে হবে যেবে ভেসে ভেসে উড়ে উড়ে ছুটে চলেছেন। থাকা-খাওয়ার কিছুটা অসুবিধা মেনে নিলে পুরো ভ্রমণটা হবে উপভোগ্য। এ্যডভেঞ্চার প্রিয় মেয়েরাও অনায়াসে রেমাক্রি পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারবেন।

কিছু পরামর্শ
১. থানচি থেকে নৌকায় উঠার সময় কলা কিনে নিতে পারেন। মাত্র ১০০ টাকায় পাবেন এক কাঁদি চাঁপা কলা। নৌকায় বসে চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আর কলা খেতে খেতে সময় যে কিভাবে চলে যাবে বুঝতেই পারবেন না।
২. এই ভ্রমণের সময় একটু সাবধান থাকা জরুরী। হাতি পোকার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য এন্টি মসক্যুইটো ক্রীম নিতে ভুলবেন না। ভুলে গেলে এর মাসুল পরে দিতে হবে।
৩. আর্মি বা বিডিআর এর রেফারেন্স ছাড়া নাফাখুম ভ্রমণে যাবেন না। অবশ্যই রেফারেন্স ও অন্যান্য বিষয় জেনে নিয়ে তারপর যাবেন। এতে তিন্দু ও রেমাক্রিতে বিডিআর-এর আতিথেয়তা পেতে কষ্ট হবেনা। আর বিডিআর-এর আতিথেয়তা পেলে থাকা-খাওয়ার সম্ভাব্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা-টা সহজেই মিলে যাবে। সাথে পাবেন নিশ্চিন্ত নিরাপত্তা।