গ্রীষ্মের মায়াঝরা তিন ফুল- জারুল হিজল সোনালু

838

জারুল : গ্রামবাংলায় জারুল গাছ একটি অতি পরিচিত নাম। প্রকৃতিকে মাতিয়ে রাখতে জারুল ফুলের কোনো জুড়ি নেই। জারুল সাধারণত জমির আইলে পরিত্যক্ত অবস্থায় এমনিতেই জন্মায়। পাপড়ির নমনীয় কোমলতায় দৃষ্টিনন্দন বর্ণচ্ছটা নিয়ে প্রকৃতিকে আরও সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে জারুল ফুল। পাতাঝরা বড় আকারের বৃক্ষ। বাকল মসৃণ ও রং ধূসর বা পিতাভ ধূসর। ফুল বেগুনি। কাঠ শক্ত মসৃণ ও টেকসই। সহজে কাজ করা যায়। পানির নিচেও ব্যবহার করা যায়। গাছের উচ্চতা ৮০ থেকে ১০০ ফুট বা তদূর্ধ্ব। জারুল ফুল আর ফলের বিপুল সমাহার গ্রীষ্মে প্রকৃতিকে দিয়েছে অনন্য মনোরম মর্যাদা। পাশাপাশি রসালো আম, জাম, কাঁঠাল ও ফলফলাদির সঙ্গে ফুলের মাধ্যমে প্রতি বছর নয়নাভিরাম অস্তিত্বের জানান দেয়। জারুল ফুল এ মৌসুমেরই অন্যতম দৃষ্টিনন্দন। গরমের মাত্রা যতই বাড়ছে জারুল ফোটার তীব্রতা ততই বাড়ে। তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে জারুলের মুগ্ধতা কমতে থাকে। আর নয়নাভিরাম দৃশ্য গাঁওগ্রামের পাশপাশে আলপথ মেঠোপথে ঘুরে-ঘুরে বুকে ধারণ করে প্রকৃতিপ্রেমিকরা। জারুল সবুজ ও বাকল হালকা ময়লা বাদামি বর্ণের। আর ছয়টি মুক্ত পাপড়িতে গঠিত এই ফুল।

জারুল গাছে ফুল ফোটে এপ্রিল থেকে জুন মাসে। ফল পরিপক্ব হয় অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে। জারুল দৃষ্টিনন্দন শোভায় সবাইকে মোহিত করে। জারুল ফুলের আকৃতি ভিন্ন হলেও ফুলের রং সাধারণত কচুরি ফুলের মতো বেগুনি হয়ে থাকে। এক সময় জারুল বেশ দেখা যেত, এখন কোথাও কোথাও দেখা মিললেও তেমন একটা দেখা মিলে না। প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাড়ি-ঘর বানানোর কাজে, লাঙ্গল, পুল, নৌকা, ট্রাক, বাসের বডি তৈরিতে জারুল কাঠ ব্যবহার করা হয়। এই কাঠ অতি উন্নতমানের। জারুল গাছের পাতা ও বাকলে ট্যানিন আছে। বেগুনি রঙের ফুলের জন্য ঘন পল্লবের জন্য সড়কের ধারে এবং জলাশয়ের পাড়ে ও পলিমাটিতে এ গাছ ব্যাপক হারে লাগান যায়। উন্নতমানের খুঁটি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। জারুল একটি ঔষধি গাছ বীজ, ছাল ও পাতা ডায়াবেটিস রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও জ্বর, অনিদ্রা, কাশি ও অজীর্ণতা মানব কল্যাণে জারুল উপকার সাধন করে। এক দিকে সৌন্দর্য আরেক দিকে ঔষধি গুণ বৈজ্ঞানিক নাম : লেজারোস্ট্রোমিয়া (Lagerstroemia Fles-reginac). লাইথ্রেসি (Lythraceae), ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়া এবং মাটির আনুকূল্যে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানত চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলের নিন্ম এলাকায় এবং সোনারগাঁওয়ের গ্রামাঞ্চলে ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহা-সড়কে ধারে জারুল গাছ ব্যাপক পাওয়া যায়।

হিজল : হিজল মাঝারি আকারের চিরহরিৎ বৃক্ষ। বাকল ঘনছাই রঙের ও পুরু। ফুল রেসিমোস, লম্বা ও লাল বর্ণের স্টামেন যুক্ত। ডালপালার বিস্তার চারদিকে। উচ্চতা ৩০ থেকে ৪০ ফুট। গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এবং বাঁচে দীর্ঘদিন। হিজল কাঠ খুব নরম, সাদা বর্ণের উজ্জ্বল ও মসৃণ। এই কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি ও সস্তা দামের আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এই গাছ নানাভাবে হাওরের জীব-বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধি ও উপকার করে। এটি জলজ প্রকৃতির বৃক্ষ, বর্ষায় মাছের খাবার তৈরিতে সাহায্য করে। পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। জেলে ও কৃষকের বন্ধু। প্রখর রৌদ্রে কৃষক এর ছায়ায় আশ্রয় নিতে পারে। আবার ঘূর্ণিঋড় ও বজ্র ঝড় যা সচরাচর এপ্রিল-মে (বৈশাখ) মাসে হয়ে থাকে। আবার নদীতে ঢেউ, তুফানে ঘরবাড়ি ভাঙনের হাত থেকে এটি প্রতিরক্ষার কাজে সাহায্য করে। জ্বালানি হিসেবে উত্তম ব্যবহার ও বাকল থেকে ট্যানিন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের জলাবদ্ধ এলাকা খাল, বিল, নদী-নালা, হাওর, বাঁওড় নীচু জলাবদ্ধ এলাকার তীরভূমিতে জন্মে ও ডোবার ধারে সর্বত্র হিজল গাছ চোখে পড়ত, এখন তুলনায় কম। হিজল গাছ প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয়, হিজল গাছ চিনেনা বা নাম শোনেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতি থেকে ধীরে-ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে হিজলের অস্তিত। হিজল ফুল ফোটার মৌসুম বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ।

আমাদের দেশে কোনো কোনো অঞ্চলে উঁচু জমির আলপথে, কাঁচা রাস্তার পাশে হিজল দেখা যেত। হিজল গাছ এখন আর গ্রামগঞ্জে তেমন একটা দেখা যায় না। শীতকালে ফুলের আগমন ঘটে, তাতে প্রকৃতিকে মাতিয়ে রাখতে হিজলের কোনো জুড়ি নেই! সংস্কৃত ভাষায় হিজলকে নিচুল হিজল বলে চিনে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে হিজল ফুল ফোটে। লাল, গোলাপি রঙের লম্বা পুষ্পদের মধ্যে অসংখ্য ফুল ঝুলন্ত অবস্থায় ফোটে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুল ফোটা শুরু হয়। আর গন্ধ চার পাশে ছড়িয়ে মুগ্ধ করে। সকালের আলোয় ঝরে যায়। হিজল তলায় সকালে গেলে মনে হবে গোলাপি বিছানার ওপর ফুলগুলো ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে পড়ে থাকে, তখন কুড়িয়ে নিয়ে কেউ হিজলের মালা গাঁথে। গ্রামগঞ্জে পানির ওপর পরা হিজল ফুলের আস্তরণ চেনা রূপ দেখে অনেকে মুগ্ধ হন। রাতে বা ভোরে হিজল তলার সামনে দিয়ে গেলে বা দূর থেকে মিষ্টি ঘ্রাণে মাতাল করে! শৈশবে হিজলের ফুল দিয়ে মালা গেঁথেছি, তার অনুভূতি এখনও অনুভব করি। হিজল ফুল শেষ হলে গাছে ফল আসে, দেখতে অনেকটা হরতকী ফলের মতো, তবে ফলটি তিতা। হিজল মাঝারি ধরনের। ডালপালার বিস্তার চারদিকে। আকার গোলাকার। বৈজ্ঞানিক নাম : Barringtonia acutangula. পরিবার : মিরটেসি (Myrtaeeae). হিজল গাছের আদি নিবাস বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়।

সোনালু : সোনারঙের সোনালু ফুলের গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। গাছগুলোর ঝলকে পুরো আশপাশ যেন আলোকিত করেছে। এই ফুল ফোটার প্রকৃত সময় গ্রীষ্মকাল। সোনালু ফুল মধ্যম আকৃতির পাতাঝরা বৃক্ষ। ফুল হলুদ সোনালি বর্ণের। দীর্ঘ লম্বিত ফুলের জন্য এ গাছ বিখ্যাত। ফল গোলাকৃতি লম্বা ঘন বর্ণের শিম। বাকল ঘন পুরু, ছোট গাছের বাকল মসৃণ, বাইরে ধূসর বর্ণের আর ভিতরে লালচে বাদামি রং। বড় গাছের বাকল লালচে বাদামি, পুরু আঁশের মতো ফাটলযুক্ত। গ্রীষ্মের শুরুতে দু’একটি কচি পাতার সঙ্গে ফুল ফুটতে শুরু করে। শীতকালে সব পাতা ঝরে যায়। দুই-একটি কচি পাতার সঙ্গে হলুদ সোনালু রঙের অসংখ্য ফুল মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। সোনারঙের হলদে ফুলের গাছটি দেখতে মন্দ নয়। গ্রামবাংলায় এই সোনালু ফুল নানা নামে পরিচিতি পায় যেমন- সোনালু, সোনাইল, বান্দর-লাঠি নামেই সবাই এক নামে চিনে। তবে শীতকালে ফুলগুলো সৌন্দর্যমণ্ডিত বলে মানুষের মন কাড়ে। কথিত আছে বানর-লাঠি কেউ যদি ঘরে রাখে, তাহলে ঝগড়া বাধতে পাড়ে।

এই ফল যদিও ঔষধি ফল, ঝগড়ার ভয়ে বান্দর-লাঠি ঘরে রাখতে চায়, তাহলে বারণ করেন গুরুজন। সোনালু রঙের ফুল গাছজুড়ে ঝাড় লণ্ঠনের মতো ঝুলতে দেখা যায়। এ ফুলের পাপড়ির সংখ্যা দীর্ঘ, চার-পাঁচটির মতো। সবুজ রঙের গর্ভে কান্তের মতো বাঁকানো থাকে। সবুজ রঙের ফল বেশ লম্বা লাঠির মতো গোল, তাই বানে পাতা, ফল মিঠা বলে খেতে বেশ পছন্দ করে। তাই প্রিয় খাবার বলে খায়। সোনালু গাছের উচ্চতা ৩০ থেকে ৪০ ফুট। সোনালু কাঠ ঘরের খুঁটি ও অন্যান্য কাজের চাহিদা আছে। আর বাকল ও শিকড় থেকে ট্যানিন পাওয়া যায়। ঔষধ হিসেবে বাকল, ফল ও পাতা শাঁস বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য বহুল ব্যবহৃত হয়। তাতে মানুষ উপসমও হয়। সোনালু ফুল, ফল যেখানে সেখানে পাওয়া যায় না। সারি-সারি কয়েকটি গাছে যদি ফুল ফোটে থাকে, তাহলে চোখ যেন ঝলক মারে, সেই ফুলগুলো খুবউ দৃষ্টিনন্দন বলা যায়। সোনালুর বৈজ্ঞানিক নাম : ক্যাসিয়া ফিসটুলা (Cassia Fistula). পরিবার : লিগোমিনেসি (Leguminosae). এই ফুল গাছ বাংলাদেশের সব জায়গায় কমবেশি পাওয়া যায়।