গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছে ট্রাম্প

118
ছবি: সংগৃহীত

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যর্থ হলেই সাধারণত খবরের শিরোনাম হয়। তবে এখন নিশ্চয়ই গোয়েন্দাদের প্রাপ্য কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, কয়েক মাস ধরে তাঁরা লাগাতারভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কোভিড-১৯ নিয়ে সতর্ক করেই যাচ্ছিলেন এবং ট্রাম্প তা আমলে নিচ্ছিলেন না। কয়েক বছর আগে থেকেই তাঁরা বলছিলেন, বড় একটি মহামারি আসতে পারে, কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের দিক থেকে এই হুঁশিয়ারিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়নি।

গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিজুড়ে গোয়েন্দারা করোনাভাইরাসের হুমকির বিষয়ে বারবার বললেও ট্রাম্প তা কানে তোলেননি। এতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই, কারণ দীর্ঘদিনের চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি এটি স্পষ্ট করতে পেরেছেন যে তাঁর মতের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বললে বা পরামর্শ দিলে তা তিনি ভালোভাবে নিতে পারেন না। গত বছর কংগ্রেসে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কয়েকটি বিষয়ে ট্রাম্পের মতের বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দেখানোর পর ট্রাম্প অমনোযোগী ছাত্রদের উদ্দেশে শিক্ষকেরা যেভাবে বলে থাকেন, অনেকটা সেভাবে বলেছিলেন, ‘গো ব্যাক টু স্কুল’।

অনেক আগে থেকেই ট্রাম্প গোয়েন্দাদের শত্রুজ্ঞান করে থাকেন। গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে চলমান ট্রাম্পের এই যুদ্ধের খেসারত হিসেবে এ যাত্রায় বহু লোকের প্রাণহানি হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো করোনাভাইরাসের আসার খবরই শুধু আগে থেকে বলেনি, কী করে তাকে প্রতিহত করা যেতে পারে, সে বিষয়েও বিশদভাবে জানিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প কিছুই করেননি।

প্রতিদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে যেসব গোয়েন্দা নথি ও বিশ্লেষণ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, তা সাধারণ মানুষ দেখতে পান না। এ কারণে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জনসমক্ষে ব্রিফিং দেওয়ার সময় এমনভাবে বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন, যাতে যেসব কথা জনসমক্ষে বলা যায় না, সেসব বিষয় সম্পর্কেও ভাসা–ভাসা একটা ইঙ্গিত দিয়ে যান। দুঃখজনকভাবে এই বছর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কংগ্রেসে সিআইএর ব্রিফিং দেওয়া স্থগিত করা হয়েছে।

ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের (ডিএনআই) প্রাথমিক কাজ হলো গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে তথ্য পেলে তা প্রেসিডেন্টকে অবহিত করা। ২০১৯ সালে ডিএনআই প্রধান ড্যান কোটস কংগ্রেসকে জানান, ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়া ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছিল। তিনি কংগ্রেসকে এটিও বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের সঙ্গে ট্রাম্প দেখা করার পরও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা অটুট আছে। ডিএনআইর এই ব্রিফিং ট্রাম্পকে যারপরনাই হতাশ করেছিল।

বৈশ্বিক মহামারি সম্পর্কে ডিএনআইদের বার্ষিক রিপোর্টে অনেক আগে থেকেই হুঁশিয়ার করা হচ্ছে। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই তৎকালীন ডিএনআই ডেনিস ব্লেয়ার প্রথম হুঁশিয়ারি দেন, যেকোনো সময় একটি ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি আমেরিকাকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। সেই মহামারিতে বহু প্রাণহানি ঘটতে পারে। এরপরই এইচওয়ানএনআই বা সোয়াইন ফ্লুর আবির্ভাব ঘটে। ২০১০ সালে ডেনিস ব্লেয়ার কংগ্রেসকে বলেন, তাঁরা মহামারি প্রতিরোধে সরকারকে যে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন, তার খুবই সামান্য গ্রহণ করা হয়েছে।

তাঁর উত্তরসূরি জেমস ক্ল্যাপার ঠিক একইভাবে ২০১৩ সালের মার্চে জুনোটিক ভাইরাসের সংক্রমণের হুমকির কথা বলেছিলেন। ক্ল্যাপার তখন বলেছিলেন, এমন নতুন কোনো ভাইরাসের উদয় হতে পারে, যা গোটা বিশ্বকে ঝাঁকুনি দিতে পারে। ক্ল্যাপার বলেছিলেন, ‘এটি মোটেও কোনো হাইপোথিটিক্যাল হুমকি নয়।’ ২০১৭ সালে ডিএনআই ড্যান কোটস ঠিক একই কথা ট্রাম্পকে বলেছিলেন। ওই সময় বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যদ্বাণীতে বলেছিলেন, মহামারির কারণে জিডিপি ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে।

এরপর ২০১৯ সালে ড্যান কোটস ট্রাম্পকে বলেন, অচিরেই একটি মহামারির কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব এবং তা থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনই ব্যবস্থা না নিলে বাঁচতে পারবে না। কিন্তু ট্রাম্প গোয়েন্দা সংস্থার সব বক্তব্যকে উড়িয়ে দিয়ে এবং সবাইকে হতাশ করে কোভিড-১৯ মহামারিকে ‘দৈব সংকট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রথম দিকে তো তিনি ভাইরাসটির অস্তিত্বই স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন যদি এত দিন ধরে এ ধরনের বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে থাকত, তাহলে হয়তো এতগুলো মানুষকে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হতো না।

দুঃখের বিষয়, যে গোয়েন্দারা এমন একটি ভাইরাসের কথা আগাম বলে দিতে পারলেন, সেই গোয়েন্দারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি শুধু একটি মাত্র ব্যক্তির অহমের বলি হিসেবে লাখ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
কেন্ট হ্যারিংটন সিআইএর জনসংযোগ বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা
সূত্র: প্রথম আলো