করোনাভাইরাস সংকটকালে কৃষির শক্তি

126
ছবি: সংগৃহীত

আবদুল আউয়াল মিন্টু
মহামারি চলাকালীন অবশ্যই যে কোনো জাতির প্রাথমিক দায়িত্ব ও কর্তব্য জনগণের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানো, জীবন বাঁচানো। চলাচলে বিধিনিষেধের মূল কারণ ঝুঁকি কমানো। ওষুধের অবর্তমানে এটি যথাযথ পদক্ষেপ। পরিণামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে গেছে। উৎপাদন কমে গেছে। আমদানি-রপ্তানিতে ধস নেমেছে। বিমান, স্থল ও সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম সীমিত।

এটি সত্য, জীবন বাঁচানোর তাগিদে শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ প্রয়োজন। এটিও সত্য, জীবন বাঁচাতে হলে অনেক উপকরণের প্রয়োজনীয়তা আছে। ওইসবের উৎপাদন চালু না রাখলে জীবন বাঁচানো যাবে না। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এসব পণ্যের উৎপাদন শুধু স্বাভাবিক পরিমাণে নয়, বরং আগের তুলনায় আরও বাড়াতে হবে। যেমন ওষুধ, জীবন রক্ষার সরঞ্জাম ও খাদ্য পণ্যের উৎপাদন। অন্যথায় মহামারির হাত থেকে বাঁচাতে পারলেও ক্ষুধা থেকে নয়। খাদ্য উৎপাদন বলতে শুধু চাল নয়, বরং অন্যান্য খাদ্যপণ্য যেমন গম, তৈলবীজ, শাকসবজি, মসলা, ফলমূল এবং গবাদিপশু, পোলট্রি, ডিম, দুধ ও মাছ, এমনকি লবণ। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এগুলো হলো মৌলিক। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। যেমন বীজ, সার, বালাইনাশক, পশুখাদ্য ও ওষুধ। এগুলো কৃষি খাতের আওতাভুক্ত।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বহু দেশে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক দেশ খাদ্যসামগ্রী রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এমতাবস্থায় খাদ্যের জন্য পরনির্ভরশীলতা হবে বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক। দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ছাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে কমছে আবাদি জমি। বর্ধিত জনসংখ্যা, আবাদকৃত জমি হ্রাস, উৎপাদনশীলতায় স্থবিরতা- এসব মিলে দেশে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন এমনিতেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বৃহৎ জনসমষ্টির খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এ মৌসুমেই খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।

নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ
কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রান্তিক কৃষকদের অবশ্যই পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের খাদ্য ও নগদ সহায়তা দিতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা’। যেমন উৎপাদন বাড়াতে উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, তেমনিভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বিক্রয় এবং ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাকে চলমান রাখা। কৃষিপণ্যবাহী যানবাহন যাতায়াতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা দুর্বৃত্তদের দ্বারা যেন হয়রানির শিকার না হয়। স্থানীয় প্রশাসনকে এটা নিশ্চিত করতে হবে।

উৎপাদন সরবরাহ ব্যবস্থার অর্ধেক মাত্র। বাকি অংশ প্রান্তিক চাষিদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি ও ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো। অনেক উৎপাদিত কৃষিপণ্য পচনশীল। এসব ফসল সংগ্রহ করতে বিলম্ব করা যায় না। মাঠে ফেলেও রাখা যাবে না। ঘরে গুদামজাত করাও সম্ভব নয়। পচনশীল ফসল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সংগ্রহ ও বিক্রি করতে হবে। যেমন তরমুজ, পেঁপে, কলা, টমেটো, শসা, লাউ, বেগুন, ঢেঁড়স, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সব ধরনের শাক ইত্যাদি। এসব পণ্য যথাসময়ে বাজারজাত করতে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা প্রয়োজন। যেগুলো গুদামজাত করা যায়, সেগুলো স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক সংগ্রহ করে গুদামজাত করতে হবে। তাহলে প্রান্তিক চাষিরা আর্থিক সংকট থেকে মুক্তি পাবেন। এমন সংকটময় অবস্থায় চাষিরা উৎপাদন ও উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ে সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়াতে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যাবে এবং কভিড-১৯-এর প্রভাবে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা
শহরাঞ্চলে বসবাসকারী নাগরিকদের খাদ্যের জোগানে গ্রামাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত। দেশের ৬০ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ সরাসরি কৃষি খাতে জড়িত। অতএব, এ সংকটকালে কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সচল রাখার সঙ্গে শুধু খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নয়, বরং ৬০ শতাংশ কর্মজীবী মানুষের জীবিকা সরাসরি জড়িত। কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো গেলে এসব কর্মজীবী মানুষের আয়-উপার্জন বাড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা শুধু খাদ্য ‘উৎপাদন ও সরবরাহ’ বাড়ানো নয়, এর সঙ্গে জড়িত ‘কেনার সামর্থ্য’। সামর্থ্য না থাকলে বাজারে খাদ্যের সরবরাহ যথেষ্ট থাকলেও সেটা অনেকের নাগালের বাইরে থেকে যাবে। কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল থাকলে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের কেনার সামর্থ্য বাড়বে। সুসংহত হবে জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা। একই সঙ্গে চাষিদের আয় বাড়াবে। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর ব্যতিক্রম হলে দারিদ্র্যের হার দ্রুতগতিতে বেড়ে যাবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে সব ঝুঁকিগ্রাহকদের মিথস্ট্ক্রিয়ায় একটি সুসঙ্গত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সেই পরিকল্পনা নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।

শ্রমিকের অবাধ যাতায়াত
বিশ্বের যে কোনো দেশে কৃষিকাজের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিকরা করেন। দেশের অভ্যন্তরেও তাই। দৈনিক বণিক বার্তার (এপ্রিল ১৪) হিসাবে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৬টি জেলায় কৃষি শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে, ২৯টি জেলায় শ্রমিক উদ্বৃত্ত। হাওর অঞ্চলগুলোতে মৌসুমি বন্যা এড়াতে এপ্রিলের মাঝামাঝি ধান সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। অন্যান্য অঞ্চলে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়। এখন ভুট্টা সংগ্রহও চলছে। তাই বিভিন্ন জেলায় কৃষি শ্রমিকের প্রয়োজন। উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে ঘাটতি এলাকায় শ্রমিকরা যেন অনায়াসে যাতায়াত করতে পারেন, সেজন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা প্রয়োজন। শ্রমিক যাতায়াত, থাকা ও খাওয়া সহজ করার লক্ষ্যে; স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচয়পত্র দিতে হবে; উৎসাহ প্রদানে তাদের পরিবারকে অন্তত এক মাসের খাদ্য সহায়তা দিতে হবে; যাতায়াতের আগে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।

অস্থায়ী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবন বীমার আওতায় আনতে হবে। হাওর এলাকায় বজ্রপাতে অনেক শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন। বীমা থাকলে তাদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবে। সব স্কুল এখন বন্ধ, তাদের স্কুল প্রাঙ্গণে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া আবশ্যক। প্রতিদিন তাদের শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখতে হবে। জ্বর, মাথাব্যথা বা কাশির লক্ষণ থাকলে তাদের আইসোলেশনে নিতে হবে। কৃষি শ্রমিকদের ভর্তুকি দরে চাল বিতরণ কার্যক্রমের আওতায় আনা উচিত। এমন সংকটময় অবস্থায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, পোশাক খাতের শ্রমিক, যারা বাড়িতে আছেন, তাদের কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহ ও প্রেরণা দিতে হবে। দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এটিকে জাতির প্রতি বিশেষ কর্তব্য হিসেবে গণ্য করা উচিত।

ধান সংগ্রহ
সরকার ধানের প্রধান ক্রেতা। সমস্যা হলো, সরকার একই সময় মিলারদের কাছ থেকে চালও কেনে। একই সঙ্গে ধান-চাল সংগ্রহের এই ব্যবস্থাটি রাজনৈতিক। চালের ক্রয়মূল্য ধান থেকে আনুপাতিক হারে বেশি। তাতে কৃষকরা ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষকরা ধান বিক্রি করতে গেলে কর্মকর্তারা নানা কারণ দেখিয়ে গড়িমসি করেন। সরকারের এই পদ্ধতিতে চাল কেনা উচিত নয়। তবে মিল মালিকদের একই দামে কৃষকদের থেকে ধান ক্রয়ে উৎসাহ দিতে পারে। সরকার বোরো মৌসুমে ৮ লাখ টন ধান সংগ্রহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। বিরাজমান কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের আলোকে ক্রয়ের পরিমাণ সীমাবদ্ধ না রেখে চাষিরা যে পরিমাণ বিক্রয় করেন, পুরোটাই ক্রয় করা উচিত।

কৃষিঋণ ও প্রণোদনা
আসন্ন মৌসুমে অধিক খাদ্য উৎপাদনকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে কৃষকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার এবং অপরিশোধিত ঋণের ওপর বকেয়া সুদ মওকুফ করা উচিত। বকেয়া ঋণ থাকলে পরিশোধের মেয়াদ নূ্যনতম এক বছর বাড়ানো উচিত। সঙ্গে নতুন ঋণ দিলে ভালো হবে। সুদের হার প্রথম বছর হবে শূন্য শতাংশ। তারপর স্বাভাবিক কৃষিঋণের হারে হওয়া উচিত। কৃষিঋণের ওপর বর্তমান সুদের হার ৯ শতাংশ। বাণিজ্যিক ঋণের ওপর সুদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি খাতে সর্বোচ্চ হার ৪ শতাংশ ধার্য করা উচিত। কৃষি উপকরণ উৎপাদনকারী ও কৃষি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকেও কৃষিঋণের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে বীজ ও কীটনাশকের ওপর ভর্তুকি দেওয়া উচিত।
কভিড-১৯-এর প্রভাবে প্রান্তিক চাষিরা কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন যারা পচনশীল পণ্য যেমন- তরমুজ, কলা, পেঁপে, টমেটো, সবজি, ফুল ও দুধ উৎপাদন করেন।

গত ১০ বছরে ফুলের বাজার ও উৎপাদন ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ বছর কভিড-১৯-এর কারণে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে কলার কাদি গাছ থেকে নামাচ্ছেন না কৃষক। তরমুজ ও টমেটো মাঠে রেখে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামের ক্ষুুদ্র চাষিরা দুধ উৎপাদন করেন। তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মাছের বেলায়ও তাই। চাষিরা নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। কোনো জায়গায় শ্রমিকের স্বল্পতা, কোথাও ক্রেতার স্বল্পতা, কোথাও যানবাহনের স্বল্পতা, কোথাও বাজারে যেতে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। এক কথায় পচনশীল ফসল আবাদিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি বা সহায়তা সব কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশে মোট চাষি পরিবারের সংখ্যা ৩ কোটি ৫৫ লাখ। এর মধ্যে ৬৫ লাখ বরগাদার। ২৩ লাখ চাষির নিজস্ব কোনো জমি নেই। বরগাদার ও ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা ৮৮ লাখ, মোট কৃষক পরিবারের ৩০ শতাংশ। কৃষিপণ্য উৎপাদনে তারা বড় ভূমিকা পালন করেন। তাই যে কোনো ধরনের সাহায্য, সহায়তা, প্রণোদনা বা ভর্তুকি তাদের কাছে পৌঁছানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

করোনাভাইরাস বিশ্বের প্রতিটি দেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়তে পারে। অতএব স্থানীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদনে জোর দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বাড়াতে যেসব উপখাত জড়িত, সবাইকে সরকার কর্তৃক ঘোষিত ভর্তুকি এবং উদ্দীপনা প্যাকেজের আওতায় আনা বাঞ্ছনীয়। তাদের সবার লক্ষ্য এক। দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা গেলে এই সংকটকালে কৃষি হতে পারে অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি ও উজ্জ্বল অকুস্থল।

লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ, সভাপতি বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশন, সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই