করোনাভাইরাস এবং বাংলাদেশ

41
ছবি: সংগৃহীত

আহমদ রফিক:
‘হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা’ করোনা-মারি আমাদের বেশ কিছু সামাজিক সত্য-প্রিয়-অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দিয়েছে করোনা-আতঙ্ক, মৃত্যুভীতি, সামান্য মানবিক মূল্যবোধের প্রকাশ, পাশাপাশি ব্যাপক সমাজবিরোধী চরিত্রের ব্যক্তিস্বার্থের ব্যাপক প্রাধান্য ও নানামাত্রিক দুর্নীতি যা দীর্ঘদিন ধরে সমাজে সচল, সেই সঙ্গে জনবান্ধব চরিত্রের তুলনামূলক গৌনরূপ- যদিও এই বিশেষ ক্ষেত্রে সামগ্রিক সরকারি ভূমিকার বিবেচনায় মূলত সরকারপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকাই ইতিবাচক।

তা মূলত ত্রাণ বিতরণের অর্থায়নে এবং আর্থিক প্রণোদনায় কিন্তু দুই হাতে সব সামাল দেওয়া যায় না। করোনা ও তার আনুষঙ্গিক দুর্যোগের সঠিক ব্যবস্থাপনায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা যেমন অপরিহার্য, তেমনি বিশেষ দায়িত্ব স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি মন্ত্রণালয়ের- সর্বোচ্চ দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। অথচ তাদের দিক থেকে দেখা গেছে প্রাথমিক পর্ব থেকে এক ধরনের শিথিলতা, কারও ভাষায় উদাসীনতা, যা দায়িত্বহীনতার শামিল।

গোটা বিষয়টির কিছুটা বিশদ বিচারে বলতে হয়, জানুয়ারিতে (২০২০) যখন চীনে করোনার বোমা ফাটল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হলো, দূরদর্শী চিন্তা তখনই শুরু হওয়া উচিত ছিল, বিশেষ করে যখন তা ইউরোপে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভাবনাটা হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন একে বিশ্ব-মারি ঘোষণা করে, তখনই কার্যকর তৎপরতা শুরু হওয়া উচিত ছিল- বাংলাদেশে করোনা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো সমন্বিত কার্যক্রমে বিন্যস্ত করার কাজ শুরু করা।

অর্থাৎ হাসপাতালগুলোকে যতটা সম্ভব সাধ্যমতে প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, এ কাজে সেনাবাহিনী অর্থাৎ চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনার মুখোমুখি হওয়া উপযোগী মাস্ক-পোশাকাদির পর্যাপ্ত সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা যথাসম্ভব দ্রুত বাস্তবায়ন করা। এ কাজে বেসরকারি সংশ্নিষ্ট খাতের সাহায্য গ্রহণও ছিল দূরদর্শিতার পরিচায়ক।

এ কাজও যে সুষ্ঠুভাবে হয়নি, তার প্রমাণ প্রথমত চিকিৎসক-সেবিকাদের চিকিৎসায় অনীহা, সাধারণ অবরোধ ঘোষণার নিয়ম মেনে তাদের গৃহবন্দি থাকা, যা নিয়ে দেখা গেছে প্রচুর সমালোচনা। ঘটেছে কয়েকটি করুণ বিয়োগান্ত ঘটনা, যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশ। এ দায় শুধু চিকিৎসক-নার্স নয়, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোরও।

ঘটনা এখানে শেষ নয়। একপর্যায়ে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী সবাই যার যার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এলে দেখা গেল তাদের মধ্যে করোনার আক্রমণ সর্বাধিক, মৃত্যুও ঘটছে। একজন চিকিৎসকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ অনেককে শোক প্রকাশ করতে দেখা গেল। একটি দৈনিকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রথম পাতায়- ‘স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণ নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছেই’।

একই সংবাদ অন্য একটি দৈনিকে ভিন্নমাত্রায়, পেশাগত দিক থেকে সংবাদটি তাৎপর্যপূর্ণ- ‘ডাক্তার-পুলিশ এত আক্রান্ত! স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী মিলে করোনা আক্রান্ত এ পর্যন্ত ৪৩৪ জন (২৩-৪-২০২০)। আরেকটি সংবাদপত্রে ইঙ্গিতপূর্ণ শিরোনাম :’সেবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।’ অর্থাৎ উপযুক্ত সুরক্ষা না পেলে পেশাগত ক্ষেত্রে কী চিকিৎসক-নার্স, কী পুলিশ যদি পেশাকর্মে বিরতি দেওয়ার কথা ভাবে প্রাণ বাঁচাতে, তাহলে কী হবে?

এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি, নিম্নমানের মাস্ক তৈরি নিয়ে ক্ষোভ প্রধানমন্ত্রীর। প্রশ্ন করা যায়- কোথায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী? ইতোপূর্বে এসব অসীম ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ্য করার মতো (২০-৪-২০২০) প্রথম পাতায় মোটা হরফে লিড নিউজ :’তোপের মুখে দুই মন্ত্রী’। এরা হলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী।

এ শিরোনামের বিশদ বিবরণে না গিয়ে মর্মবস্তুর দিকে তাকালে দেখা যায় আমাদের সূচনা বক্তব্য মাফিক দায়িত্বে শিথিলতা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠিত কমিটি (চেয়ারম্যান স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী) করোনাবিষয়ক সমন্বিত কার্যক্রমে প্রায় অকার্যকর অবস্থায় পরিণত, তাই সংবাদপত্রে তোপদাগা।

ইতোপূর্বে আমরা যে দুঃখজনক শিরোনামগুলো উদ্ৃব্দত করেছি, তারই একটির পাশে পেশাজীবীদের বিপর্যয়ের কারণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘নেপথ্যে মানহীন পিপিই ও মাস্ক’। ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, করোনা মহাব্যাধিতে কিছু অপ্রিয় সত্যের প্রকাশ, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্নীতি, সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি, যা প্রায় জাতীয় চরিত্রের অঙ্গীভূত হয়ে পড়েছে।

এই সত্যটিই করোনাকালের জাতীয় দুর্যোগে সত্য হয়ে রয়েছে যে, করোনার মতোই বা তার চেয়েও শক্তিমান, কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। নিম্নমানের পিপিই ও মাস্ক তৈরি করে ব্যাপক মুনাফা বাণিজ্যের লোভে সে মানবিক কার্যক্রমে রত পেশাজীবীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় ক্ষুব্ধ শিরোনাম :’ক্রান্তিকালেও চলছে দুর্নীতি’।

যেখানে বারবার প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি নানা খাতে ত্রাণ বিতরণ থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিরোধক তৈরির ক্ষেত্রে- স্বভাবতই প্রশ্ন ও দাবি একই সঙ্গে- নিম্নমান পিপিই সরবরাহের দায় নির্ধারণে একটি সৎ, দলনিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট প্রদান অপরিহার্য নয় কি? এবং তাতে কারও দোষত্রুটি প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তিও দরকার। কারণ মৃত্যুর বিকল্প নেই, মৃত মানুষ ফিরে আসে না। যুক্তিহীন কারণে মৃত্যুর বিচার ও শাস্তি সংবিধানসম্মত।

স্বভাবতই আমরা দেখছি, সাংবাদিক মহল করোনা আক্রমণে অসাধারণ ভূমিকা পালন করছে। সেই নির্ভীক ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাদেরও কোনো কোনো সদস্য করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। তারা যে সবাই সুস্থ হয়ে কাজে ফিরবেন, এমন কী গ্যারান্টি আছে? আমরা তাই একটি দৈনিকের একটি দাবি-শিরোনামের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত : ‘মাস্ক কেলেঙ্কারির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন’।

এ দাবিটি অবশ্য মূলত টিআইবির কিন্তু আমাদের মনে হয় এ দাবি শুধু মাস্ক নিয়ে নয়, পুরো নিম্নমান পিপিই নিয়েই হওয়া উচিত। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ ও সমালোচনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি এ ব্যাপারে নির্বিকার থাকে, সে ক্ষেত্রে খোদ প্রধানমন্ত্রীরই এগিয়ে এসে তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত এবং তা এমন কমিটি নয়, যা রিপোর্ট দিতে বছর কাটিয়ে দেবে।

কারণটি হচ্ছে, একটি কথা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বিশিষ্ট চিকিৎসকদের মুখেও শুনতে পাচ্ছি যে, করোনা মহামারি রূপধারণ করলে তার কার্যকর মোকাবিলা করার সাধ্য-সামর্থ্য ও অবকাঠামো আমাদের নেই। কাজেই পূবাহ্নে সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যা ঘটতে পারে তা দুঃস্বপ্নের মতোই হতে পারে।

এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। ‘অলপ্রুফ’ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের দ্রুত সচেতন হওয়া ও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া দরকার। দরকার সংশ্নিষ্ট সবাইকে নিয়ে সমন্বিত কার্যক্রমে করোনারোধে একটি সর্বাত্মক জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের কর্মসূচির ব্যাপক মাত্রায় দায়িত্ব গ্রহণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এখন প্রধান কর্তব্য।

সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে সত্যটি বর্তমান সংকটে, আমাদের জন্য অপরিহার্য বা করোনা সংক্রমণ একটি জাতীয় সংকট- এর ভয়ংকর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিচার করে ইউরোপ-আমেরিকায় এর পরিস্থিতি ও পরিণাম লক্ষ্য করে একে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগে সরকারি-বেসরকারি বিবেচনা অর্জন করে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হবে, দ্রুত প্রতিরোধক ব্যবস্থা ও অবকাঠামো নির্মাণে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। না হলে সম্মুখে সমূহ বিপদ, সেটা জাতীয় পর্যায়ে সামাল দেওয়া একপর্যায়ে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, অসাধু-অসৎ-দুর্নীতিবাজ-মুনাফাবাজদের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নেওয়া, প্রয়োজনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ ওই করোনাবিরোধী যুদ্ধেরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। না হলে অধিকাংশ সৎ প্রচেষ্টা ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে দল-বেদল বিবেচনা যুক্তিহীন, বলাই বাহুল্য।

প্রাক-করোনা পর্বে আমাদের উদাসীনতায় শিথিলতার প্রশ্নটি দূরে থাক, এখন দরকার বিশ্বপরিক্রমায় শিক্ষা গ্রহণ করে জাতীয় পর্যায়ে ঐকবদ্ধভাবে দলনিরপেক্ষ সমন্বয়ে করোনাযুদ্ধে জয়ের প্রচেষ্টা চালানো, পেশাজীবীদের সর্বোচ্চ সহায়তাদান, নিম্নবর্গীয়দের অনাহারমুক্ত রাখার পরিকল্পনার সৎ বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান গ্রহণ। করোনার বিরুদ্ধে জয়ে এর কোনো বিকল্প নেই।

আর করোনা-উত্তর পর্বেও বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে দরকার হবে করোনাযুদ্ধ থেকে শিক্ষাগ্রহণ, সততা, আন্তরিকতা ও কর্মনিষ্ঠাকে পুঁজি করে জাতীয় চেতনাকে মাথায় রেখে দলনিরপেক্ষ ঐক্যে কর্মতৎপরতায় অগ্রসর হওয়া। দেশ পুনর্গঠনে, সৎ সমাজ গঠনে সেটাও হবে আরেক প্রকার লড়াই, যার অন্যতম চেষ্টা হবে দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ। না হলে জাতি তথা রাষ্ট্রের পক্ষে সুস্থ অবস্থায় টিকে থাকা কঠিন হবে। এ সত্যটি আমাদের সবাইকে, বিশেষভাবে শাসকশ্রেণিকে মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নবর্গীয় ও স্বল্প আয়ের মানুষের কথা, যারা করোনার আক্রমণের পরোক্ষ শিকার।

লেখক: গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী