ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন ভারত

168

অল্প সময় আর স্বল্প টাকায় ঘুরে আসা যায় যে দেশটি তার নাম ভারত। এই ঈদে আপনি ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন। দেখে নিন ভারতের কোন দশটি অসাধারণ জায়গায় আপনি যেতে পারেন ঈদের ছুটিতে।

শৈল শহর দার্জিলিং
যদি ভালোবাসেন পাহাড়, অরণ্য, সবুজ আর বরফে মোড়া হিমালয়, তাহলে নির্দ্বিধায় বেছে নিতে পারেন দার্জিলিং। এখানে একই সঙ্গে আপনি উপভোগ করতে পারবেন একই দিনের বিভিন্ন সময়ে হিমালয়ের বিভিন্ন রূপ।

কীভাবে যাবেন:
কম সময়ে দার্জিলিং যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হলো বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী সীমান্ত দিয়ে। এই পথে শিলিগুড়ি সবচেয়ে কাছে। সকালে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা পৌঁছে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারবেন দার্জিলিং। এ ছাড়া আপনি বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্দা সীমান্ত দিয়েও যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা বেশি লাগবে দার্জিলিং যেতে। জনপ্রতি স্বাভাবিক খরচ করলে এই ঈদে ১০০ ডলারের মধ্যে ঘুরে আসতে পারবেন দার্জিলিং।

পাহাড়ের স্বর্গ উদ্যান রিশপ
যাঁরা শুধু পাহাড় ভালোবাসেন, ভালোবাসেন পাহাড়ের সবুজ, নির্মল বাতাস, নির্জন অরণ্য, অজানা-অচেনা পাখির গান, অজানা ফুলের ঘ্রাণ, ঝরা পাতার ওপর বছর ধরে ঝরে পড়া শিশিরের টুপটাপ শব্দ, পাহাড়ি জুম ঘরে অনবরত ঝরে পড়া বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দ, নানা রঙের মেঘেদের অবহেলায় উড়ে বেড়ানো, পাহাড়ের পর পাহাড়ের সিঁড়ি, এক পাহাড়ে মেঘের বিছানা, তো অন্য পাহাড়ে কুয়াশার চাদর, এক পাহাড়ে বৃষ্টির গান তো আরেক পাহাড়ে রোদের ঝিলিক, তাদের জন্য রিশপ প্রথম পছন্দের জায়গা। রিশপে বসে পাহাড়কে যতভাবে উপভোগ করা যায় আর কোথাও বসে আপনি সেটা পারবেন না।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে কালিম্পং। সেখান থেকে রিজার্ভ জিপে করে রিশপ। আর খরচের ব্যাপারটা না হয় গিয়ে খরচ করেই অবাক হয়ে যাবেন! ১০-১৫ হাজার টাকার মধ্যে ঘুরে আসতে পারবেন রিশপ থেকে।

স্মৃতিময় কলকাতা
বাঙালির আজন্ম দুর্বলতা আছে বোধ হয় পুরোনো কলকাতা শহরের প্রতি। ভারত উপমহাদেশের সাবেক রাজধানী কলকাতায় এখনো পাবেন অতীতের একটা স্বাদ। ইতিহাসের সঙ্গে যদি থাকে বাংলা সাহিত্যের প্রতি দুর্বলতা তাহলে কলকাতার মায়া আপনাকে কিছুতেই ছাড়বে না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র, মধুসূদন, সত্যজিৎ, উত্তমকুমার বা সুচিত্রা সেনের স্মৃতির সঙ্গে বা কফি হাউসে নিজের স্মৃতি জড়িয়ে রাখাটা কলকাতা না এলে পূরণ হবে না।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে সরাসরি প্লেনে, বাসে, ট্রেনে যেতে পারেন কলকাতা। যদি শুধুই কলকাতা ঘুরতে চান তাহলে খরচ খুবই কম। দেড় শ বা দু শ ডলারের মধ্যে ঘুরে আসতে পারবেন কলকাতা।

আপেল গ্রাম হারশিল
যত দূর চোখ যায় রংবেরঙের আপেলের বাগান আর গাছে গাছে ঝুলে থাকা বিভিন্ন রঙের সুমিষ্ট আপেল সেই সঙ্গে পাহাড়, অরণ্যের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে পাহাড়, বরফে জড়ানো, কুয়াশা মোড়ানো পর্বতের চূড়া, অনন্তকাল ধরে বয়ে চলা একলা নদী, এমন জায়গাই কি আপনি খুঁজছিলেন এই ঈদের ছুটি কাটানোর জন্য? তাহলে আপনাকে যেতে হবে ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের দেরাদুন শহর থেকে ২২০ কিলোমিটারের দূরের হারশিলে। আপেল গ্রাম হিসেবে সবাই চেনে হারশিলকে।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে প্লেন বা ট্রেনে দেরাদুন। সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে ৪ ঘণ্টার রাস্তা হারশিল। ট্রেনে গেলে খুব বেশি খরচের সম্ভাবনা নেই। জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা খরচেই ঘুরে আসতে পারবেন এই আপেল অরণ্য থেকে।

এশিয়ার সুইজারল্যান্ড পেহেলগাম
কেমন পাহাড় দেখতে চান আপনি—সবুজ? রুক্ষ, অরণ্যে ঘেরা? মেঘে ঢাকা? কুয়াশামাখা? নাকি বরফে জড়ানো? কিংবা কেমন নদী দেখতে চান—উত্তাল, খরস্রোতা, পাথুরে পানিতে মাতলামি করা নদী? একসঙ্গে সবই পাবেন পাগল করা পেহেলগামে। যেখানে চুপচাপ বসে থাকতে পারেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চাইলে বসতে পারেন নদীর একদম মাঝখানে কোণ পাথরের ওপরে! পাহাড়-নদীর সঙ্গে নদীতে মেশা ঝরনা পাবেন এখানে। অথবা পাবেন সবুজ বনানী। পেহেলগামের সৌন্দর্য লিখে বোঝানো যাবে না। তাই ঘুরেই আসুন এই ঈদের ছুটিতে।

কীভাবে যাবেন:
ট্রেনে ঢাকা-কলকাতা-জম্মু কিংবা প্লেনে ঢাকা-কলকাতা-শ্রীনগর থেকে শেয়ার বা রিজার্ভ জিপে অথবা লোকাল বাসে করে চলে যেতে পারবেন পেহেলগামে। জনপ্রতি খরচ হবে ট্রেন ও প্লেন ভেদে ২০-৩০ হাজার টাকা।

ধূসর পাহাড়ের লেহ
লাদাখের লেহ শহরে পৌঁছে চারপাশের রুক্ষ প্রকৃতি দেখে আপনি কিছুটা হতাশ আর অভিমানী হয়ে উঠতে পারেন। তবে যখন বাসস্ট্যান্ড থেকে আপনি আপার কারজু এলাকার দিকে যেতে থাকবেন আপনার হতাশা আর অভিমানের মেঘ কেটে যেতে থাকবে সুখের বাতাসের পরশে। আপার কারজুর বাঁকে বাঁকে অপরূপ সৌন্দর্য আর মায়ায় মাখা একেকটা বাড়ি, হোটেল আর অতিথিশালা দেখে! প্রতিটি বাড়ির গেটের দুদিকে পাবেন আপেল গাছ আর আঙুরের আহ্বান! পাবেন আখরোট, হলুদ আর ভীষণ মিষ্টি সুস্বাদু এপ্রিকট ফল! পাবেন তাজা সবজি। পাবেন প্রতিটি বাড়ির বেলকনি, জানালার কার্নিশ, সামনের লন সব জায়গায় রংবেরঙের নাম না জানা ফুলের টব!

কীভাবে যাবেন:
লাদাখের লেহ যাওয়াটা একটু কঠিন, কষ্টকর আর খরচসাপেক্ষ। ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে ট্রেনে দিল্লি বা কালকা, কালকা থেকে মানালি, মানালি থেকে জিপ বা বাসে লেহ দুই দিনের পথ। এ যাত্রায় সময় লাগবে মোটামুটি ১২-১৫ দিন। আর জনপ্রতি খরচ হবে ৩০ হাজারের ওপরে।

বিধাতার নিজের বাড়ি মুন্নার
চারদিকে সবুজের সমুদ্র, ঢেউখেলানো চা-বাগান, ছোটবড় পাহাড় আর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা রুপালি ঝরনা, গভীর বন, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি—এসব নিয়েই মুন্নার। কেরালা যদি হয় বিধাতার রাজ্য তাহলে মুন্নার হলো সেই রাজ্যে বিধাতার নিজের বাড়ি! বুঝতেই পারছেন, অপার নিসর্গের দেশ কারালাতেই স্বপ্নের মুন্নার।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে ট্রেন বা প্লেনে ইরনাকুলাম। ইরনাকুলাম থেকে বাস বা কারে করে ৩-৪ ঘণ্টা পাড়ি দিলেই মুন্নার। খরচ জনপ্রতি ১৫-৩০ হাজার প্লেন ও ট্রেন ভেদে।

হ্রদ-পাহাড়ের নৈনিতাল
পাহাড়-হ্রদ আর রঙিন বাড়ি এই নিয়ে অভিজাত নৈনিতাল। পাহাড় ভালোবাসুন বা হ্রদ অথবা সবুজ সব একসঙ্গে পাবেন নৈনিতালে। ইচ্ছে করলেই এখানে হ্রদের জলে ভেসে, জলে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি দেখে, পাহাড়ে মেঘের দল দেখে কাটিয়ে দিতে পারেন আপনার অলস ছুটির সময়। এমন পাহাড় আর লেকের মিতালি উপভোগ করতে চাইলে চলে যেতে পারেন ভারতের শীতল আর অভিজাত পাহাড়ি শহর নৈনিতালে।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে প্লেন বা ট্রেনে কাঠগোদাম হয়ে মাত্র ৩০ কিলোমিটার পাহাড়ের আভিজাত্য নৈনিতাল। জনপ্রতি খরচ হতে পারে ট্রেন ও প্লেন ভেদে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা।

ভারতের নায়াগ্রা হোগেনেক্কাল
নদী আর নদীর স্রোতোধারা দিয়ে যে এমন অপূর্ব, অগণিত ঝরনাধারার সৃষ্টি হতে পারে হোগেনেক্কাল জলপ্রপাত নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। হোগেনেক্কাল ভারতের অন্যতম সেরা ঝরনার একটি। এখানে জলপ্রপাতের একেক জায়গায় একেক রূপ। কোথাও ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে, কোথাও হুট করেই খরস্রোতা আবার কোথাও উন্মাদ, উন্মত্ত আর উচ্ছ্বসিত জলপ্রপাতের অবিরাম ছুটে চলা। আবার কোথায় কাবেরী নদীর সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে ছুটে চলা।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে ট্রেনে মহিশূর। মহিশূর বা বেঙ্গালুরু থেকে বাসে ৩-৪ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলেই চলে যাবেন হোগেনেক্কাল। জনপ্রতি খরচ হতে পারে ১০-১২ হাজার টাকা।

দিল্লি-সম্রাটের আঙিনায় ট্রানজিট পয়েন্ট
মোগলদের হাতে বিকশিত হওয়া শহর ভারতের রাজধানী দিল্লি। এখানে দেখার জায়গা আছে অনেকগুলো। যেমন: লালদুর্গ, চাঁদনিচক, কুতুবমিনার, স্বামী নারায়ণ আকশারধাম, জামা মসজিদ, বাদশা হ‌ুমায়ূনের সমাধি, লোদি গার্ডেন, ইন্ডিয়া গেট, গান্ধী স্মৃতি, বাহাই মন্দির বা পদ্মমন্দির ইত্যাদি। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার ট্রানজিট পয়েন্টও এই শহর। ট্রানজিটে থাকলে অলস বসে না থেকে ঘুরে দেখতে পারেন ভারতের রাজধানী। দিল্লির অলিগলি ঘুরলেই আপনি দেখতে পারবেন মোগল আমলের আর আধুনিক সময়ের অনেক স্মারকস্মৃতি।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে দিল্লি সরাসরি প্লেনে যেতে পারেন। এতে জনপ্রতি খরচ হবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে প্লেনে বা ট্রেনে দিল্লি যাওয়া যায়। এতে খরচ কিছুটা কম। কলকাতা থেকে প্লেনে গেলে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে জনপ্রতি ঘোরাঘুরি হয়ে যাবে আর ট্রেনে ১০ হাজারের মধ্যে।

শেষ কথা:
বিদেশে দল বেঁধে ঘুরতে যাওয়া ভালো। এতে খরচ সাশ্রয় হবে। ওপরের সকল খরচ ৬ থেকে ৮ জনের গ্রুপের প্রতি জনের জন্য। তবে শুধুমাত্র একক পরিবার বা হানিমুন কাপল হলে এই খরচ নিশ্চিতভাবে কিছুটা বেড়ে যাবে। বিদেশ ভ্রমণের সময় বাজেটের বাইরে কিছু অর্থ অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন, যেটা খুব দরকার ছাড়া কিছুতেই খরচ করবেন না।