Home » ইটে গাঁথা এক প্রাচীন শৈল্পিক স্থাপত্য অযোধ্যা মঠ

ইটে গাঁথা এক প্রাচীন শৈল্পিক স্থাপত্য অযোধ্যা মঠ

কর্তৃক BDHeadline

Tour-bd.com: বাগেরহাট শহরটা যেন প্রাচীন যুগের এক নয়নাভিরাম কাঠামোর উপরে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক জনপদ। কী নেই এখানে? আছে প্রাচীন মসজিদ, বিশাল দীঘি, প্রশস্ত নদী আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সেই ধারণাই এবার আরেকটু বাড়বে আপনার আজকের লেখা পড়ার পরে।

বন্ধু অচিন্ত্য আসিফ এসেছে খুলনায়। তিনি বিশিষ্ট কবি, দার্শনিক এবং ভ্রমণবিদ। আমার দেয়ালে ঝোলানো একটি প্রাচীন ঘরানার অদ্ভুত ইমারত কাঠামোর দিকে তার নজর চলে গেলো।
–কিরে এটা? কোনো স্মৃতিসৌধ নাকি?
দেখলাম ওর নজর আগের চেয়ে তীক্ষ্ণ হয়েছে। আমি বললাম, স্মৃতিসৌধ বটে। ওটার নাম অযোধ্যা মঠ।
–অযোধ্যা মঠ মানে? তোদের রাম ঠাকুরের (রাম ঠাকুর অর্থাৎ ভগবান শ্রী রামচন্দ্র) মঠ।
আমি হেসে বললাম, না রে ব্যাটা! এটা বাগেরহাটের অযোধ্যা গ্রামে তাই অযোধ্যা মঠ বলে। অনেকে অবশ্য কোদলা মঠ নামেও চেনে। কোদলা হলো গিয়ে পাশের গ্রাম।

-বাহ, দেখতে তো সুন্দর।
ওর মুখ থেকে প্রশংসা ঝরে পড়ল। আমি জিজ্ঞাস করলাম, যেতে মন চাচ্ছে নাকি?
-হুম।
-তাহলে চল।

সুতরাং আমরা পরেরদিন সকালে রওনা দিলাম কোদলা মঠের উদ্দেশ্যে। কোদলা মঠের পরিসর খুব কম। তাই আমাদের প্লান ছিল রথ দেখা আর কলা বেচার কাজ- দুই সেরে নেব। প্রথমে যাব ষাট গম্বুজ মসজিদে। গতবার ওখানকার জাদুঘরটা মিস হয়ে গেছে।

খুলনার সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠলাম দুজন। আমাদের নিয়ে চিংড়ির ঘেরের মাঝখান দিয়ে বানানো রাস্তার উপর দিয়ে বাস ছুটে চলল বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে। তারপর একসময় নামিয়ে দিলো ষাটগম্বুজ মসজিদের সামনে। দুজনই জাদুঘরে ঢুকলাম। এক টিকিটেই কাজ হয়। আমরা ভেতরে ঢোকার পরে হাত নিশপিশ করতে লাগলো সেখানকার ছবি তোলার জন্য। কিন্তু সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ছবি তোলা নিষেধ।

যাই হোক, ঘোরাঘুরি শেষে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে প্রথমে যেতে হবে যাত্রাপুর। সেখান থেকে আবার গাড়ি বদল করে যেতে হবে অযোধ্যা মঠে। পথে অনেকগুলো গ্রাম পড়লো- নামগুলো অদ্ভুত সুন্দর। বাজনদার বাড়ির হাট, লাউডগা আরো কী কী যেন। খানিকদূরে পথের মাঝে দেখি একটি মন্দির। নতুন বানানো। তার পাশেই একটি রথ পড়ে আছে। কয়েকদিন আগে রথযাত্রা হয়েছিল তার প্রমাণ। এই জায়গার রথযাত্রা নাকি আশেপাশের মধ্যে খুবই বিখ্যাত। এমনকি এখানকার বিগ্রহগুলো নাকি সোনার তৈরি। কিন্তু সেসব নয়, আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নিলো একটি ক্ষুদ্র সমাধি মন্দির।

সমাধি মন্দিরের নাম ফলকের পরে একটি অদ্ভুত আঘাতে চিহ্ন। সেই আঘাতের কেন্দ্র থেকে অনেকগুলো ফাটল চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে জানতে পারলাম, যুদ্ধের সময়কার ঘটনা এটি। তখনকার মন্দিরের মহন্তকে এখানে এনে তার পূর্ববর্তী মহন্তের সমাধি মন্দিরের সামনে গুলি করা হয়। এগুলো সেই গুলির দাগ।

আমরা এগিয়ে গেলাম। রাস্তার পাশ দিয়ে একটি বদ্ধ প্রায় ভরাট হয়ে যাওয়া জলপ্রবাহ। সেটি নাকি ভৈরব নদী (অথবা তার শাখা)। এক সময় আমরা পৌঁছে গেলাম অযোধ্যা মঠে। এখন সূর্যদেব পশ্চিম গগণে ঢলে পড়েছে। তার লাল আলোয় লাল ইটে নির্মিত স্থাপত্যটি আরো মনোহর দেখাচ্ছে। মঠটি পোড়া ইটে নির্মিত। এর বিশেষ আকর্ষণীয় দিক হলো মঠের গায়ের অপূর্ব কারুকাজ সমৃদ্ধ অলঙ্করণ।

মঠটি আনুমানিক ১৮.২৯ মিটার উঁচু। দেয়ালের পুরুত্ব ৩.১৭ মিটার আর বর্গাকার প্রত্যেক দেয়ালের দৈর্ঘ্য ভেতরের দিক থেকে ২.৬১ মিটার। মঠে প্রবেশের মোট ৩টি পথ। ধারণা করা হয়, দক্ষিণ দিকের প্রবেশ পথটি ছিল মূল ফটক। বাকি প্রবেশপথ দুটি পূর্ব দিকে ও পশ্চিম দিকে। সবগুলোই ভেতর দিক থেকে বন্ধ। তাই আমরা ভেতরে ঢুকতে পারলাম না।

কোদলা মঠের নির্মাতা কে সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থাপত্যের শৈলী থেকে অনুমান করা হয় যে এটি ষোড়শ শতাব্দীর শেষ অথবা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নির্মিত। উড়িষ্যা অঞ্চলে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত যে ‘রেখা’ পদ্ধতির মন্দির নির্মাণ পদ্ধতি দেখা যায় তার প্রভাব পড়েছে এতে।

ধারণা করা হয় এটি কোনো দেব-মন্দির নয়। সম্ভবত কোনো সাধক কিংবা মহাত্মার সমাধি -স্তম্ভ স্বরূপ মঠটি নির্মিত হয়েছিল। মঠের দক্ষিণ দিকের কার্নিশের নিচে থেকে পাওয়া ইষ্টক লিপির তথ্য অনুযায়ী মঠটি ব্রাহ্মণ দেবতার অনুগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন।

তবে স্বীকৃত মত অনুসারে, বারো ভূঁইয়ার অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্য তাঁর গুরু ‘অবিলম্ব সরস্বতীর’ স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করেছিলেন। এই ব্রাহ্মণ গুরুদেব ছিলেন একজন অসাধারণ পণ্ডিত, সাধক এবং ঈশ্বরভক্ত। তিনি তাৎক্ষণিক মুখে মুখে কবিতা রচনা করতে পারতেন বলে তার নাম হয় ‘অবিলম্ব সরস্বতী’। পোড়ামাটির এমন সুন্দর কারুকাজ খুব বেশি দেখা যায় না। এটি আমাদের স্থাপত্যশৈলীর এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে আপনি দুইভাবে বাগেরহাট যেতে পারেন- সরাসরি এবং খুলনা হয়ে। ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ছেড়ে যায় অনেকগুলো বাস। সকালের ট্রিপগুলো ছাড়ে সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে। বিকেলের ট্রিপগুলো ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত।

এছাড়া রয়েছে আরা, বলেশ্বর, হামিম, দোলা প্রভৃতি পরিবহন। গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে পাবেন হানিফ, সোহাগ আর ইগলের মতো গাড়িগুলো। এগুলো আপনাকে পৌঁছে দেবে বাগেরহাট শহরে। সেখান থেকে রিকশা নিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবেন ষাট গম্বুজ মসজিদে। বাকি গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আপনাকে স্থানীয় কারো উপর নির্ভর করতে হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনে করে যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে নামতে হবে খুলনা রেল স্টেশনে। তারপর সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড থেকে কিংবা রূপসা ঘাট পার হয়ে বাসে সোজা ষাটগম্বুজ মসজিদ।

কোথায় থাকবেন?
খুলনার অন্যতম আধুনিক হোটেল হলো ‘হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল’। এটি কেডিএ এভিনিউতে অবস্থিত। এখানে থাকতে হলে ভালোই টাকা খসবে আপনার। সিঙ্গেল রুমের জন্য পড়বে বারোশ টাকা আর ডাবল টুইন রুমের জন্য দুই হাজার টাকা।

আরেকটি অভিজাত হোটেলের নাম ‘হোটেল ক্যাসল সালাম’। সুইমিং পুলবিশিষ্ট এই হোটেলটি হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনালের সামনেই অবস্থিত। এখানে থাকতে হলে আপনাকে গুণতে হবে নন এসি সিঙ্গেল: ১০০০ টাকা, এসি স্ট্যান্ডার্ড সিঙ্গেল: ১৫০০ আর স্ট্যান্ডার্ড কাপল: ১৮০০ টাকা। এছাড়া আছে হোটেল সিটি ইন, হোটেল জেলিকো, হোটেল ইন্টারন্যাশনাল ইন, হোটেল মিলেনিয়াম প্রভৃতি।

কম খরচে থাকতে চাইলে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের পাশে অনেকগুলো হোটেল আছে। ফেরিঘাট বাস টার্মিনালের সামনেও কিছু হোটেল রয়েছে।

এছাড়া আপনি চাইলে বাগেরহাটেও থাকতে পারেন। বাগেরহাট সদরে অনেকগুলো হোটেল আছে। পাশাপাশি আছে সরকারি গেস্ট হাউস। লোকপ্রিয় হোটেলের একটি রেল রোডে অবস্থিত মমতাজ হোটেল। এই হোটেলটিতে সেবার মান বেশ ভাল এবং খরচও একটু বেশি। মমতাজ হোটেলের আশেপাশে থাকার জন্য আরো কিছু হোটেল রয়েছে। খান জাহান আলীর মাজারের সামনে আছে হোটেল অভি। এখানে থাকতে হলে গুণতে হবে ৪০০ টাকা।

সম্পর্কিত পোস্ট