আসেন গালি দেই, সৌম্য-লিটন-সাকিব-মাশরাফিকে

560

২০০৭ বিশ্বকাপে তারকাখচিত দল নিয়েও ভারত যখন বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকে বাদ পড়লো, সেটা ভারতীয় সমর্থকদের জন্যে ছিল অভাবনীয় একটা ঘটনা। প্রথাগতভাবেই উপমহাদেশের লোকজন একটু বেশিই সেন্সেটিভ, যেকোন ঘটনায় খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। সেটারও কোন ব্যতিক্রম হলো না। তখন ফেসবুক-টুইটার ছিল না, খেলোয়াড়দের প্রোফাইলে গিয়ে গালাগাল করা যেতো না। সরাসরি হামলা চালানো হলো ক্রিকেটারদের বাড়িতে, রাঁচিতে ধোনীর বাড়ির সামনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হলো, ঢিল পড়লো রাহুল দ্রাবিড়-যুবরাজ সিংদের বাড়িঘরে।

এর আগে একবার ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেমিফাইনালে দলের হার মেনে নিতে না পেরে খেলা চলাকালীন সময়েই ইডেন গার্ডেনের গ্যালারীতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় দর্শকেরা। মাঠে বৃষ্টির মতো উড়ে আসছিল পানি আর কোকের বোতল। আম্পায়ারেরা বাধ্য হয়েছিলেন সেখানেই খেলা থামিয়ে দিতে। উচ্ছৃঙ্খল দর্শকদের তাণ্ডব সামাল দিতে পারছিল না কলকাতা পুলিশও। পরে শ্রীলঙ্কাকে সেই ম্যাচে জয়ী ঘোষণা করা হয়।

এই দুটো ঘটনা অনেকেই জানেন। এগুলো শুনলে মনে হয় না, ভারতীয়রাই বুঝি ক্রিকেটবিশ্বের সবচেয়ে নোংরা মানসিকতার সমর্থক? আমার কিন্ত সেটা মনে হয় না। একটা সময় হয়তো এসবে ভারতীয়রা এক নম্বরে ছিল, কিন্ত সেই আসন থেকে এখন তাদের হঠিয়ে দিয়ে সবচেয়ে জঘন্য ক্রিকেটীয় ফ্যানবেইজের জায়গাটা দখল করেছি আমরা, বাংলাদেশীরা!

অনেকেই আপত্তি জানাতে পারেন। কিন্ত আর কোন দেশের ক্রিকেটারদের ধর্মের কারণে নিজ দেশের লোকজনের হাতে বাজে গালাগালির শিকার হতে হয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। ভারতেও মুসলমান ক্রিকেটারেরা খেলেন, ঈদের দিনে কেউ ফেসবুকে ছবি আপলোড দিলে সেখানে তার ধর্ম তুলে গালাগাল করার কোন খবর আমরা কখনও পাইনি। এমনটা শুধু বাংলাদেশেই হয়। এখানে ক্রিকেটারেরা নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবি আপলোড দিলেও বাজে মন্তব্য আসে, তারা সেসব ছবিতে প্রাইভেসি দিতে বাধ্য হন।

আমাদের সমর্থকদের আরেকটা বাজে ব্যাপার হচ্ছে গোল্ডফিশ মেমোরি। ক্রিকেটারদের অবদানের কথা আমরা নিমেষেই ভুলে যাই, এক-দুই ম্যাচ কেউ রান বা উইকেট না পেলেই তাকে শূলে চড়াই। সৌম্য থেকে লিটন, রিয়াদ থেকে তাসকিন, কেউ বাদ যায়নি আমাদের এসব অসামাজিক আচরণ থেকে। আবার আমরাই অন্য কেউ খারাপ করলে তাদের জায়গায় আবার খারাপ খেলে বাদ পড়া জায়গা দেয়ার জন্যে লাফালাফি করি!

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই করে হেরেছে বাংলাদেশ, আর এই হারের পর থেকেই দেখছি অনেকে দলে পরিবর্তন চাইছেন। কেমন পরিবর্তন? তারা লিটন দাসকে দলে চান। ভালো কথা, লিটনকে দলে চাওয়া যেতেই পারে, ইনফর্ম ব্যাটসম্যান তিনি, তারচেয়ে বড় কথা, ছন্দে থাকা লিটনের ব্যাটিং দেখার চেয়ে চমৎকার অভিজ্ঞতা খুব বেশিকিছু হতে পারে না।

কিন্ত কয়েকজনকে দেখছি, তারা তামিম ইকবালের পরিবর্তে লিটনকে দলে চাইছেন! আর ইউ কিডিং? ফাজলামি নাকি ভাই? তামিম ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালসহ বিশ্বকাপের প্রথম দুই রান পাননি, তাই তারা এখন তামিমের শেষ দেখে ফেলছেন! শালার গোল্ডফিশ মেমোরি বোধহয় এটাকেই বলে।

যে ব্যাটসম্যানটা নিজের ব্যাটিংটাকে আমূলে বদলে ফেলেছেন বিশ্বসেরাদের একজন হবেন বলে, গত বিশ্বকাপের পর থেকে ওয়ানডেতে যার গড় ৫৭’র বেশি, এই সময়টাতে রোহিত শর্মা বা মার্টিন গাপটিলদের মতো ওপেনারকে যিনি পেছনে ফেলেছেন গড়ের দিক দিয়ে, তাকে বাদ দিতে চাওয়ার জন্যে মাথায় উৎকৃষ্ট মানের গোবর থাকা লাগে। কিছু মানুষের সেটা আছে, বোঝাই যাচ্ছে।

গত চার বছরে তামিম কয়টা ম্যাচ জিতিয়েছেন দলকে? কয়টা ম্যাচে লড়াই করার পুঁজি এনে দিয়েছেন? এই সময়ে কয়টা সেঞ্চুরি/হাফসেঞ্চুরি আছে এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের? গুণে দেখুন। আপনাদের মাথার চুলের চেয়ে বেশি হবার কথা সংখ্যাটা। দলের সবচেয়ে বড় ভরসা তো এমনি এমনি হয়ে ওঠেননি তিনি। আর মাথামোটা গর্ধবের দল কিনা তিনটা ম্যাচে রান না পাওয়াতে তাকে দল থেকে বের করে দিতে চায়!

এরচেয়ে ভয়াবহ জিনিস কি জানেন? একদল বলছে, পেস বোলিং এটাকে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ভালো কথা, কে বাদ যাবে, আর কে ঢুকবে? তাদের জবাব- এই দলের ভেতরে মাশরাফি নাকি বোঝা হয়ে গেছেন, তাই তাকে বাদ দিয়ে রুবেলকে নেয়া হোক। সর্বশেষ ম্যাচটায় মাশরাফির অধিনায়কত্বে তারা বুঝে গেছেন যে, দলকে দেয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই মাশরাফির মধ্যে, তাই তাকে বাদ দাও! আমার মনে প্রশ্ন জাগে, এই ছাগলের বাচ্চাগুলোকে জন্মের পরে ছয়মাস ধরে শালদুধ না খাইয়ে গরুর গোবর খাওয়ানো হয়েছিল কিনা? নইলে এমন উদ্ভট ভাবনা কি করে মাথায় আসে?

ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলারের নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকার করেছেন এই মানুষটা, সর্বোচ্চ উইকেট মুস্তাফিজের। ২০১৫ বিশ্বকাপেএ পর থেকে কমপক্ষে ত্রিশ ওয়ানডে খেলেছেন এমন পেসারদের মধ্যে মাশরাফির ইকনোমি রেটটা হচ্ছে চতুর্থ সর্বনিম্ন। তার ওপরে আছেন বুমরাহ, মুস্তাফিজ এবং রাবাদা।

হ্যাঁ, মাশরাফি কখনোই হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফিট থাকেন না। ক্যারিয়ারের সাতটা মেজর ইনজুরির ছোবল তার সামর্থ্যের অনেকটুকুই কেড়ে নিয়েছে। তবে পারেনি তার ইচ্ছাশক্তিটুকুকে কেড়ে নিতে। তার বলে আহামরি গতি হয়তো নেই, সেটা মাশরাফিকে কৌশলি বানিয়েছে আরও। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে সেই কৌশল।কাজ করেনি, তাই তিনি অপাংক্তেয় হয়ে যাবেন? নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার অধিনায়কত্ব আরও ধারালো হতে পারতো, কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে, কিন্ত একটা ম্যাচের কারণে চার-পাঁচ বছর ধরে তার নেতৃত্বের অবদানের কথা তো আমার পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

আপনি পলিটিক্যাল বা অন্য কোন মতাদর্শের ভিত্তিতে মাশরাফিকে পছন্দ করেন না, তাই তাকে ভুঁড়িওয়ালা বা আনফিট খেতাব দিয়ে দেন। আমার তখন মনে পড়ে, এই ভুঁড়িওয়ালা মানুষটাই আমাদের মনে বিশ্বজয়ের মন্ত্র ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই মানুষটাই আমাদের টানা জিততে শিখিয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে আমরা যে পরাশক্তিদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারি, সেটাও সম্ভব হয়েছে তার কারণেই।

এই ‘আনফিট’ মাশরাফির কারণেই আমরা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখি। প্রতিটা ম্যাচে আমরা এখন জিততে চাই, জিততে না পারলেও লড়াই করতে ছাড়ি না। প্রত্যাশার যে পারদটা আকাশে চড়িয়ে আপনারা দলে পরিবর্তন আনার কথা বলেন, সেই প্রত্যাশাটা তৈরি হয়েছে মাশরাফির কারণেই। আর সাতটা ম্যাচ খেলে এই লোকটা ক্রিকেটকে চিরবিদায় বলে দেবেন হয়তো, সেটুকু পর্যন্ত নাহয় অন্তত সবুর করুন?

ষোলোকোটি মানুষের দেশে বত্রিশ কোটি নির্বাচক হলে এমনটাই হয় বোধহয়। ক্রিকেটকে ভালোবাসার মানুষের অভাব নেই এখানে, নিজেদের মতটাও সবাই প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্ত সেটা করতে গিয়ে যখন দলের জন্যে বছরের পর বছর ধরে অবদান রাখা কোন ক্রিকেটারকে অপমান করা হয়, তার অবদানকে অস্বীকার করা হয়, সেটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

আপনি বাংলাদেশের জয় চাইবেন সেইসঙ্গে চাইবেন মাশরাফি যেন উইকেট না পায়, যাতে আপনি মন খুলে নিন্দা করতে পারেন- এটা কেমন আচরণ? দল খারাপ খেললে সমালোচনা হতে পারে, গালাগাল বা অযৌক্তিক নিন্দা কেন হবে? শরীরে আয়োডিনের অভাব থাকলে আয়োডিনযুক্ত লবন খান, নিজের আয়োডিনহীনতার প্রমাণ ফেসবুকে দিয়ে বেড়ানোর তো কিছু নেই…

লেখক: মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান আহাদ