আমরা হারাতে বা বিসর্জন দিতে বাধ্য হই : ইরেশ যাকের

41

করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছি আমরা। এ যুদ্ধে জয়ী হতে হলে মানতে হবে অনেক নিয়ম–কানুন। স্বাধীনতার মাসে এবার আমাদের জয়ী হতে হবে ব্যক্তিজীবনে নিয়ম–শৃঙ্খলা মেনে। লিখেছেন অভিনেতা ইরেশ যাকের।

স্বাধীনতার মাস। আগামীকাল ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। ৪৯ বছর আগে আমরা আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমরা কতটা স্বাধীন, এ ব্যাপারে আমাদের অনেকের অনেক ধরনের মতামত থাকতে পারে। সেটা নিয়ে আসলে আমি এখানে কিছু বলতে চাই না। আসলে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে আমাদের বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। আগামী দিনগুলোতে আরও বদলে যাবে, এ রকম ভাবাটাই সমীচীন। এই অবস্থায় আসলে সবকিছুর সংজ্ঞাই পাল্টে যায়। স্বাধীনতার সংজ্ঞাও। এ রকম অস্বাভাবিক সময় স্বাধীনতা, বিশেষ করে ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে একটু ভিন্নভাবে ভাবতে হয়। নিজেদের ভালোর জন্য, পরিবারের ভালোর জন্য, সমাজের ভালোর জন্য।

সরকার এখন পর্যন্ত জরুরি অবস্থার ঘোষণা দেয়নি। যত দিনে এই লেখা ছাপা হবে তত দিনে কী হবে, তা আমি জানি না। কিন্তু আমি এটা জানি যে অন্তত এ মুহূর্তে আমাদের সবারই স্বাধীনতা আছে বাইরে যাওয়ার। আইনের ভেতরে থেকে যেখানে যেতে চাই সেখানে যাওয়ার। এই স্বাধীনতা আমাদের প্রাপ্য। কিন্তু এখন এমন একটা সময় এসেছে যে এই স্বাধীনতা আমরা কীভাবে ব্যবহার করব, সেটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বাংলাদেশে আসলে কজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আমরা জানি না। এই রোগ এর মধ্যে কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে, সেটাও আমরা জানি না।

এতদিন আমাদের ধারণা ছিল যে বিদেশফেরত যাঁরা তাঁদের সঙ্গে মিশলে এই রোগে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। কিন্তু কদিন আগে মিরপুরে যেই ভদ্রলোক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন তিনি গত এক বছরে সজ্ঞানে বিদেশফেরত কারও সঙ্গে যোগাযোগে আসেননি। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় যে কিছুটা হলেও করোনাভাইরাস আমাদের বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা কেউই সংক্রমণের জালের বাইরে নই। আরও চিন্তার বিষয় হলো, যাঁর এই রোগ আছে সেই ব্যক্তি রোগের কোনো লক্ষণ দেখানোর আগেই সংক্রামক হয়ে পড়ে। সুতরাং এ রকম হতেই পারে যে আমি একজন রোগীর সংস্পর্শে এসেছি কিন্তু আমার সেটা বোঝার কোনো উপায়ই নেই। এ রকম হতে পারে যে আমি নিজে আক্রান্ত হয়েছি কিন্তু অন্যদের সংক্রমিত করার আগে সেটা বুঝিনি। নিজে সংক্রমিত হওয়া আর অন্যকে সংক্রমণ করার ঝুঁকি কমানোর একমাত্র উপায় হলো বাইরের মানুষের সঙ্গে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখা। আমাদের ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতার যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করা।

আমি জানি যে বাসায় থাকা কারও চাইতে কারও জন্য বেশি সহজ। কিন্তু আমার মনে হয় না যে ‘ওই বেচারা তো বাসায় থাকতে পারছে না’—এটা ভেবে নিজের বাসায় থাকার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজের পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলার পেছনে কোনো যুক্তি আছে।

বাংলাদেশে মোটামুটি একটি পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থা বিরাজমান। এখানে আমাদের সবারই স্বাধীনতা আছে বাজার থেকে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনেক কিছু কেনার। সাধারণ অবস্থাতেও এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করে অপচয় করা ঠিক না। এখনকার অবস্থায় এই স্বাধীনতার অপব্যবহারের ব্যাপারে আরও বেশি সাবধান থাকতে হবে। সরকারিভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা হোক বা না হোক, করোনাভাইরাসের হুমকি যত দিন আছে তত দিন আমাদের বাজার ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটবে। অপরিহার্য দ্রব্যের কমতি দেখা দেবে। আমাদের সবারই কমবেশি মনে হবে যে যত পারি তত কিনে রাখি। কিন্তু আমরা সবাই এ রকম আতঙ্কিত আচরণ করলে দ্রব্যের দামও বাড়বে। দ্র্যব্যের স্বল্পতাও দেখা দেবে। আমাদের নিজেদের আচরণের জন্য পাশের মানুষের কষ্ট বাড়বে। সুতরাং ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতাই না, স্বাধীনতার বিচক্ষণ ব্যবহার খুবই জরুরি।

পেশাগতভাবে আমরা যাঁরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালাই, তাদের কমবেশি সবারই ব্যবসার ব্যাপ্তি অনুযায়ী লোকবল কমানো বা বাড়ানোর স্বাধীনতা থাকে। এই স্বাধীনতা উপভোগ করার ব্যাপারেও আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটু বিশেষ করে ভাবতে হবে। করোনাভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবী ভয়াবহ মন্দার মুখে। ইতিমধ্যেই এই মন্দার প্রভাব আমরা টের পাচ্ছি। গার্মেন্টস খাতে রপ্তানি রাতারাতি অনেক কমে গেছে। এটার প্রভাব পুরো অর্থনীতির ওপরেই পড়বে। আমাদের সবার ব্যবসা কমবেশি কমবে। এমন সময় লোকসান নিয়ন্ত্রণ করার স্বাধীনতার পাশাপাশি আমাদের সহকর্মীদের প্রতি দায়িত্বের কথাও মাথায় রাখতে হবে। মন্দার চাপটা যাতে পুরোপুরি আমাদের কর্মচারীদের ওপর না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমি বলছি না যে সব উজাড় করে কর্মস্থান চালু রাখতে হবে। কিন্তু এই অসাধারণ সময়ে যতটা সবার মঙ্গলের কথা মনে রাখা যায় ততটাই মনে রাখা উচিত।

স্বাধীনতা বিষয়টা অদ্ভুত এবং জটিল। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি সমাজে যত স্বাধীনতা থাকবে ততটাই মঙ্গলজনক। আমাদের মতো সমাজে যেখানে অহরহ ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘন হয় সেখানে তো বটেই। তারপরও মাঝেমধ্যে এমন অবস্থা তৈরি হয় যখন আমাদের যতটুকু স্বাধীনতা আছে, ততটুকুও আমরা হারাতে বা বিসর্জন দিতে বাধ্য হই। নিজের কাজ করার স্বাধীনতা। কাছের মানুষকে দেখার স্বাধীনতা। এ রকম আরও অনেক নির্মল স্বাধীনতা। তখন আমরা বুঝতে পারি কী হারিয়েছি। কিন্তু তখন আমাদের হয়তো উপলব্ধি করা উচিত যে স্বাধীনতার সঙ্গে কিছু দায়িত্বও আসে। একে অপরের প্রতি সমাজের প্রতি। সমাজ এবং নিজেকে সমষ্টিগতভাবে দেখতে পারলেই হয়তো কঠিন সময়গুলো আমরা একসঙ্গে পার হতে পারি। নিজেদের আবার গড়তে পারি। একে একে করে আমাদের স্বাধীনতাগুলো ফিরে পেতে পারি। আরও স্বাধীন এক সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।

সবার সুখ এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করি। সবাই ভালো থাকি। একে অপরের জন্য বাঁচি। এই কামনাই রইল।
লেখক: অভিনেতা