বিলুপ্ত প্রায় ফল গোলাপজাম

বাড়ীর আঙ্গিনায় বা পাহাড়ী এলাকায় একসময় দেখা যেত দৃষ্টি নন্দন ও খেতে সুস্বাদু একটি ফল। যার নাম গোলাপজাম। এখন আর এই ফল খুব একটা চোখে পড়ে না। শুধু হবিগঞ্জে নয় সারাদেশেই এটি একটি বিলুপ্তপ্রায় ফল। উদ্যোগ নিলে এ ফলের সুদিন ফেরানো সম্ভব বলে মনে করেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা।

হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দেব জানান, বিলুপ্ত প্রায় ফল হল গোলাপজাম। এই ফল পাকলে গোলাপের মত কিছুটা গন্ধ বের হয় বলেই সম্ভবত এ নাম। বৃহত্তর সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাড়ীর আশেপাশে একসময় প্রচুর দেখা গেলেও এখন সব অঞ্চলেই হারিয়ে যেতে বসেছে। এই গাছ দীর্ঘদিন বাঁচে (প্রায় ৪০/৫০ বছর) এবং ফল দান করে। গাছ মাঝারী আকৃতির।

তিনি জানান, গাছ লাগানোর ২/৩ বছর পর থেকেই ফল সংগ্রহ করা যায়। গোলাপজাম গাছে মাঘ-ফাল্গুন মাসে ফুল আসে এবং বৈশাখ থেকে শ্রাবণ মাসের মধ্যে ফল পাকে। গোলাপজামের ফুলও খুবই দৃষ্টিনন্দন ।

ড. সুভাষ চন্দ্র দেব আরোও জানান, গোলাপজাম কাঁচা অবস্থায় সবুজাভ এবং কিছুটা শক্ত হলেও পাকলে নরম ও সাদাটে হয়। ভেতরে দু`টি বীজ থাকে, যা থেকে বংশ বিস্তার হয়। টক মিষ্টি স্বাদের এই ফলে প্রচুর ভিটামিন সি ছাড়াও রয়েছে ভিটামিন বি১, বি২, ক্যারোটিন এবং ক্যালসিয়াম। একটি গোলাপজামে প্রায় ৪০ কিলো ক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, বমিভাব দূর করতে এটি কার্যকর। এছাড়া গাছের ছাল ও পাতা ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী।

সুস্থ শরীরে জন্য খাদ্য তালিকায় ফল ব্যবহারের দিকে সবাই এখন সচেতন। দেশী ফলের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বিদেশী ফল আমদানী করা হয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না উচ্চ মূল্যে কেনা বিদেশী ফল থেকে দেশে ফলেই পুষ্টি থাকে বেশী। গোলাপজাম তেমনি একটি পুষ্টিকর ফল হলেও এটি এখন বন বাদাড় থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। বাড়ীর আঙ্গিনায়ও আর শখ করে এটি কেউ লাগান না। আবার নার্সারিতেও এ ফলের গাছের চারা মিলে খুব কম। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, মাধবপুর ও বাহুবল উপজেলার পাহাড়ী এলাকায় এক সময় প্রচুর পরিমাণ গোলাপ জাম উৎপাদন হতো। বাজারেও মিলত এ ফল। এখন কালে ভদ্রে দেখা মিলে এই ফলের।

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে বেশ কয়েকটি গোলাপজাম গাছ আছে। বর্তমানে সেই গাছগুলোর ফল পেকেছে। চুনারুঘাট উপজেলার বিভিন্ন বাজারেও দেখা মিলছে এই ফলের।

বিলুপ্তপ্রায় এই ফলকে রক্ষা করার তেমন কোন উদ্যোগ নেই দেশে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারী) এর মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আযাদ জানান, দেশে অনেক ফলই রয়েছে। কিন্তু আমাদের লোকবল কম থাকায় সব ফল নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর রামগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও জয়দেবপুর স্টেশনের জার্মপ্লাজম সেন্টারে গোলাপজামের গাছ আছে। তবে কোন জাত উৎপাদনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী গ্রামের আ. কাইয়ূমের বাড়ীতে একটি গোলাপ জাম গাছে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল আসে। তার পরিবারের লোকজন এই ফল খায়। সে তার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদেরকেও এই ফল দেয়। আ. কাইয়ূম জানায়, শিশুদের জন্য ফল পাকানো যায় না। গোলাপ জামের বীজ থেকে চারা হলেও সব বীজ জীবন্ত থাকে না। ফলে এর চারা উৎপাদন করা অনেক কষ্টকর।

হবিগঞ্জ শহরতলীর ভাদৈ গ্রামে অবস্থিত রূপা প্লান্ট নার্সারীর স্বত্বাধিকারী সাবেক মেম্বার মাসুক মিয়া জানান, তার নার্সারীতে দেশী- বিদেশী অনেক ধরনের গাছের চারা থাকলেও গোলাপজামের কোন চারা নেই। মানুষ এখন কাঠের চারা লাগাতে আগ্রহী। ফলে গোলাপজামের চারা কেউ খোঁজে না।

গোলাপজাম দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি ফুলও খুবই দৃষ্টিনন্দন। ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকে। পাকতে শুরু করলে ধবধবে সাদা অথবা সাদাটে হলুদ হয় বা শুধুই হলুদ হয়। কাঁচা ফল খেতে টক হলেও পাকা ফল খুবই মিষ্টি।