পোকাখেকো কলস গাছ

অনেকেই শুনেছি যে আফ্রিকাতে এমন গাছ আছে যেগুলো নাকি আস্ত মানুষ খেয়ে ফেলতে পারে, অনেক মুভিতেও তেমনটা দেখায় -আর তা দেখে আমাদের সব সময়ই মনে প্রশ্ন জাগে আসলেই কি একটি গাছ মানুষ খেয়ে ফেলতে পারে,নাকি এটা শুধু্ই কল্প-কাহিনী।সত্যি বলতে এখনো মানুষ খেকো গাছ সমন্ধে কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় নি তবে মাংস খেকো গাছ সত্যি আছে।আর সে জন্যে বেশি দূরে যাবার দরকার নেই,বাংলাদেশেই এই ধরনের গাছ আপনি দেখতে পাবেন।

কলস উদ্ভিদ। নামটা যেমন সুন্দর, দেখতেও তেমন সুন্দর এই উদ্ভিদ। তবে হ্যাঁ, সুন্দর হলেও পোকামাকড়দের কাছে কিন্তু সে এক আতঙ্কের নাম। ছোটখাটো পোকাদের ভুলিয়ে ফাঁদে ফেলতে ওস্তাদ।কলস উদ্ভিদের ইংরেজি নাম পিচার প্ল্যান্ট, বাংলায় এটি কলসি গাছ নামেও পরিচিত,পাতাগুলো কলসের মতো দেখতে হওয়ায় এটির এমন নামকরণ হয়েছে। এটি এক ধরনের মাংসাশী উদ্ভিদ।

কলস উদ্ভিদ বিভিন্ন প্রজাতির হয়।প্রায় ৮০ প্রজাতির কলস উদ্ভিদ রয়েছে পৃথিবীতে।বিশ্বের নানা প্রান্তে এই উদ্ভিদ পাওয়া যায়। দক্ষিণ আমেরিকা, মালয়েশিয়া, মাদাগাস্কার, শ্রীলংকা,ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রজাতির কলস উদ্ভিদ রয়েছে।পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাংস খেকো গাছ পাওয়া যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রজাতি গুলো হচ্ছে- কলস,স্ন্যাপ ট্র্যাপ,লবস্টার-পট ট্র্যাপ,ফ্লাইপেপার ট্র্যাপ,ব্লাডার ট্র্যাপ,ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ ইত্যাদি।

বিভিন্ন রকম কলস উদ্ভিদের পাতাগুলো বিভিন্ন রকম হয়। তবে মূল গঠন একই রকম। সবগুলোই দেখতে ফোলা কলসের মতো লাগে। ভেতরের অংশটা থাকে ফাঁপা। পাতার মুখের কাছে ঢাকনাও থাকে। প্রজাতি ভেদে পাতার রং, আকার, আকৃতি নানা রকম হয়। দৈর্ঘ্যে ২ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ২ ফুট পর্যন্ত হতে পারে কলসি উদ্ভিদের পাতা।

কলসের মতো পাতাই হচ্ছে কলসগাছের শিকার করার অস্ত্র। এগুলো সাধারণত রঙিন হয়। কলসের সঙ্গে যুক্ত পাতাটি নলের মতো হয়। এই নলের শুরুতে থাকে প্রবেশমুখ। প্রবেশমুখে উৎপন্ন হয় এক ধরনের মধু। নলের শেষ প্রান্ত ফাঁপা ও পেয়ালার মতো আকৃতির হয়। এই অংশে জমা হয় বৃষ্টির পানি।

প্রবেশমুখ সবসময় খোলা থাকে। মধুর লোভে ও রংচঙে পাতা দেখে আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন রকমের পোকামাকড় পাতার প্রবেশমুখ দিয়ে ভেতরে ঢোকে। নলের ভেতরের অংশ পিচ্ছিল হওয়ায় পোকাগুলো আর উঠতে পারে না, বরং পিছলে আরো নিচে পড়ে যায়। নলের শেষ প্রান্তে অসংখ্য শুঙ্গ থাকে।এগুলো সব পার হয়ে পোকাগুলো পড়ে যায় জমা হওয়া পানির ভেতরে। তারপর সেখান থেকে আর তারা বের হতে পারে না। এরপর পরিপাকে সাহায্যকারী এক ধরনের রস বেরিয়ে এসে পোকার শরীরের নরম অংশ গলিয়ে ফেলে উদ্ভিদের দেহে শোষিত হতে সাহায্য করে। শক্ত অংশগুলো জমা হয় কলসির নিচের অংশে। এভাবেই ফাঁদে ফেলে শিকার ধরে কলস উদ্ভিদ।

আকৃতিতে বড় পিচার প্ল্যান্ট ছোট ছোট পোকামাকড় ছাড়াও ইঁদুর এবং ব্যাঙও শিকার করে। রংচঙে কলস উদ্ভিদ দেখে আকৃষ্ট হয়ে এর কাছে আসতে বাধ্য হয় যেকোনো পোকাই। আর তারপর হতভাগ্য পোকাগুলো পরিণত হয় উদ্ভিদটির খাদ্যে। কলস উদ্ভিদ নামক এই উদ্ভিদটি একটা মনভোলানো ফাঁদই বটে!

এখন পর্যন্ত পাওয়া সেরা মাংস খেকো গাছ সম্ভবত ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ। আমেরিকার সাউথ ও নর্থ ক্যারোলিনায় এই উদ্ভিদগুলো ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। গাছগুলো প্রায় এক ফিটের মতো লম্বা হয় তবে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের পাতাগুলো দেখতে অনেকটা মুখের চোয়ালের মতো হয়। গাছের প্রতিটি পাতা তিন থেকে ছয় ইঞ্চির মতো লম্বা হয় এবং এতে অনেক গুলো ছোট ছোট লোম থাকে। যখনি ভুলে কোন পোকামাকড় এই পাতার উপর বসে পরে মুহুর্তের মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এই ভেনাস ট্র্যাপের পাতাগুলো খুবই সংবেদনশীল। এই গাছের ক্ষমতা এতো বেশী যে এটি আধ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে তার পাতা বন্ধ করে ফেলতে পারে। ঠিক এই সময় আবার পাতার লোমগুলোও পোকাকে বাইরে বের হতে বাধা দেয় ফলে পোকাটি আর সেখান থেকে বের হতে পারে না। পরবর্তীতে পাতা থেকে একধরণের বিশেষ রস বের হয়ে পোকাকে হজম করতে শুরু করে। এভাবে একটা পোকা হজম করতে ভেনাস ট্র্যাপের সময় লাগে ১০ দিনের মতো।

মাংস খেকো গাছ
ভেনাস ট্র্যাপের পাতা একসাথে ৩ থেকে ৪টি পোকা ধরতে পারে এবং পরবর্তীতে যখন এর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় তখন আবার নতুন করে পাতা গজায় এবং পুনরায় সে নতুন পাতা গুলো পোকামাকড় ধরতে থাকে। উদ্ভিত গুলোর আচরণ এমন হওয়ার কারন কি? বিজ্ঞান বলে এই গাছ গুলার বেঁচে থাকার জন্য প্রচুর পরিমানে নাইট্রোজেন প্রয়োজন হয় এবং মাটি থেকে সে যথেষ্ট পরিমানে নাইট্রোজেন না পাবার দরুন সে এমন মাংসাশী প্রানিতে পরিণত হয়েছে। আবার কিছু কিছু বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন, পরিবর্তিত পরিবেশে টিকে থাকার প্রয়োজনে বিবর্তনের মাধ্যমে এই সব উদ্ভিদ মাংসাশী প্রানিতে পরিণত হয়েছে। আরও অবাক করা ব্যাপার হলো যে এই উদ্ভিত প্রায় সকল কীটপতঙ্গই খেয়ে থাকে।