ড. কামাল হোসেনের রাজনীতি ও চাওয়া পাওয়া

ড. কামাল হোসেন রাজনীতিতে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাত ধরে। আশির দশকের শুরুতে নেতৃত্ব সংঙ্কটের সময় তাঁর প্রস্তাবেই আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাকে দলীয় প্রধান নির্বাচিত করে। সময়ের ব্যবধানে সেই ড. কামালই এখন বঙ্গবন্ধুর দল ও তাঁর কন্যার বিপক্ষ রাজনৈতিক মোর্চার প্রধান কাণ্ডারি।

শেখ হাসিনার সাথে মতবিরোধের জেরে আওয়ামী লীগ ছেড়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজস্ব দলের নেতৃত্ব দিলেও রাজনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি। তবে সরকারের নানামুখি চাপে কোণঠাসা বিএনপিকে সম্প্রতি নিজের নেতৃত্বের আওতায় নিয়ে এসে দলটিকে ড. কামাল চাঙা করে তুলেছেন বলে ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।

“শেখ মুজিবের ডান হাত হিসেবেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হন,” ড. কামাল সম্পর্কে বেনারকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ।

“আশির দশকের শুরুতে আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের ভেতর নেতৃত্ব দ্বন্দ্বে ছিলেন। তখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে ড. কামাল হোসেন শেখ হাসিনাকে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত করার প্রস্তাব দেন, যা সকলেই মেনে নিয়েছিলেন,” বেনারকে বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিদ্যার অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকার বিরোধী বৃহৎ ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ায় ৮১ বছরের ড. কামাল হোসেন এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সরকার বিরোধী পক্ষ তাঁকে স্বাগত জানালেও প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার দলীয় নেতারা প্রায় প্রতিদিনই তাঁর কঠোর সমালোচনা করছেন।

“আমরা (বিএনপি) মনে করি, এই ঐক্যফ্রন্টের কারণে সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষ আজ উজ্জীবিত। তাঁরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে,” বেনারকে বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ।

তবে ড. কামালের উদ্যোগকে ‘সরকার পতন ও নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করছেন সরকারের মন্ত্রী ও ১৪ দলীয় জোটের নেতারা।

গত শনিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পরদিন শিবচরে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্টকে ‘সুবিধাবাদীদের’ মঞ্চ বলে মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. কামাল হোসেন ‘খুনিদের সঙ্গে’ ঐক্য করেছেন।

বিরোধের সূত্র
আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাঁধে ১৯৯১ সালে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও বাম দলগুলোর যৌথ আন্দোলনে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে আওয়ামী লীগ সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তোলে। তখন ড. কামাল বলেছিলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। এরপর থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।

এরই জের ধরে ড. কামাল আওয়ামী লীগ ছেড়ে গঠন করেন গণতান্ত্রিক ফোরাম। ১৯৯৩ সালে দলের নাম থেকে ‘তান্ত্রিক’ শব্দাংশ ফেলে দিয়ে গণফোরাম নামকরণ করেন।

কামাল হোসেনকে ‘জনবিচ্ছিন্ন’ নেতা এবং তাঁর রাজনীতিকে ‘সংবাদ সম্মেলনভিত্তিক’ বলে দাবি করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অরুণ গোস্বামী।

“বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে তিনি খাপ খাওয়াতে পারেন না। এখানে রাজনীতি করতে হলে মানুষের সাথে সম্পর্ক থাকতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

অবশ্য মওদুদ বলেন, “এমন অনেক উদাহরণ আছে যে, কামাল হোসেনের চেয়েও কম জনসম্পৃক্ত বা সামান্য অবদান রাখা অনেকেই মহান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।”

কামালের কর্মময় জীবন
আইন শাস্ত্রের সব ডিগ্রি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড থেকে নিয়েছেন ড. কামাল। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সেখান থেকেই ব্যাচেলর অব সিভিল ল’, ব্যারিস্টার অ্যাট ল’ এবং এবং আন্তর্জাতিক আইনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে রাজনৈতিক জীবন শুরু করার আগে তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের কর্মী ছিলেন।

ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামিপক্ষের অন্যতম কৌঁসুলি ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর আলোচনার সময় সহযোগী হিসেবেও অংশ নেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে পদাধিকার বলে দেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। যে কারণে কামাল ‘সংবিধান প্রণেতা’ হিসেবে সমধিক পরিচিত।

পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পেট্রোলিয়াম ও খনিজ মন্ত্রী হিসাবেও দায়িত্বপালন করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়েও ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

এর আগে ১৯৭১ সালে নয় মাস পাকিস্তানের জেলে কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরেন কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধুকে ২৫ মার্চ ধানমন্ডি থেকে এবং কামালকে ৩০ মার্চ লালমাটিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, এরপর তাঁদের পশ্চিম পাকিস্তানে আলাদা জেলে রাখা হয়।

১৯৮৩ সালে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গেও কারাবরণ করেছিলেন ড. কামাল। ১৯৮১ সালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু পুরোনো ঢাকা এবং তেজগাঁও এলাকার দুটি আসন থেকে জয় লাভ করেন। পরে তিনি একটি আসন ছেড়ে দিলে সেই আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন কামাল হোসেন।

এরপর বহুবার ড. কামাল বার কাউন্সিল নির্বাচনে জয় লাভ করেছেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেননি।

জ্বালানি খাতে বিশ্বব্যাপী ড. কামাল হোসেন একজন সুপরিচিত সালিস নিষ্পত্তিকারী। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা বই ‘ল অ্যান্ড পলিসি ইন পেট্রোলিয়াম ডেভেলপমেন্ট’ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে।

জাতিসংঘের র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে তিনি আফগানিস্তানের গোলযোগপূর্ণ এলাকা দক্ষিণ গাজা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যক্তি জীবন ও পরিবার
ড. কামালের শেকড় বরিশালের শায়েস্তাবাদ, কিন্তু জন্ম ১৯৩৭ সালের ২০ এপ্রিল কলকাতার চৌরঙ্গীতে। সাতচল্লিশে দেশভাগের পর পরিবারের সাথে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন।

মানবাধিকার কর্মী এবং শিক্ষাবিদ ড. হামিদা হোসেনের সঙ্গে কামালের বিয়ে হয় ১৯৬৪ সালে। তাঁদের দুই মেয়ে সারা হোসেন ও দিনা হোসেন। ব্যারিষ্টার সারা দেশের প্রখ্যাত আইনজীবি, বিয়ে করেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে।

বার্গম্যান বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত এবং তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিতর্ক সৃষ্টি করেন।

দিনা হোসেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, তাঁর স্বামীও ব্রিটিশ নাগরিক।

ড. কামালের চাওয়া
বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে নিয়ে গড়া ড. কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠনসহ সাত দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে অবস্থান করছেন।

“এই প্রেক্ষাপটে ড. কামাল হোসেনকে সাথে পাওয়াও অনেক বড় ‘প্লাস পয়েন্ট’ বিএনপির জন্য,” বেনারকে বলেন অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ। তাঁর মতে, “ড. কামাল ভালো মানুষ, এক কথায় চমৎকার ব্যক্তি, এ ছাড়া জ্ঞানী এবং গণতন্ত্রমণা।”

ড. এমাজউদ্দীন মনে করেন, “ড. কামালকে নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান ‘ভয়ংকর’। তাঁকে নানা ঝামেলায় ফেলা হলেও অবাক হব না।”