গোলাপ চাষ পদ্ধতি

গোলাপ একটি শীতকালীন মৌসুমী ফুল। তবে বর্তমানে গোলাপ সারা বছর ধরেই চাষ করা হচ্ছে। বর্ণ, গন্ধ, কমনিয়তা ও সৌন্দর্যের বিচারে গোলাপকে ফুলের রানী বলা হয়। পুষ্প প্রেমীদের সবচেয়ে প্রিয় ফুল গোলাপ। এটি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জলবায়ুতে খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পারে বলে পৃথিবীর সব দেশেই সারাবছর কমবেশি গোলাপের চাষ হয়। গোলাপ সাধারণত কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, বাগান, লন, কেয়ারী, বারান্দা সাজাতে গোলাপের জুড়ি নাই। আতর ও সুগন্ধি শিল্পেও গোলাপের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

গোলাপের জাত
গোলাপের জাত প্রধানত ৭টি। যথা-হাইব্রিড টি, হাইব্রিড পার্পেচুয়েল, পলিয়েন্থা, ফ্লোরিবান্ডা, মিনিয়েচার এবং প্লেমবার।

জমি নিবার্চন
পানি জমেনা এমন ধরনের মাটিতে এই ফুল ভাল হয়; তবে জৈব সার মিশ্রি্ত দো-আঁশ মাটি খুবই উপযোগী। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি, ছায়াহীন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল, পানি সেচ সুবিধা আছে এমন এবং জমির পিএইচ মান ৬.০ থেকে ৭.৫ এর মধ্যে আছে এমন জমি।

আবহাওয়া
ফুলের ভাল বৃদ্ধির জন্য ৬ ঘন্টা সূর্যের আলো দরকার। তাপমাএা ১৫০ থেকে ২৫০ সেলসিয়াস থাকা ভাল।

গোলাপের চারা লাগানোর সময়
গোলাপ গাছের চারা লাগানোর সময় নির্ভর করে সেই অঞ্চলের জলবায়ুর উপর । তবে আমাদের দেশে সারা বছরই লাগানো হয়। সাধারণতঃ দুই মৌসুমে এই ফুলের চাষ করা হয়ে থাকে। একর প্রতি ১২ হাজার টি চারা লাগাতে হবে।

রবি মৌসুম
সেপ্টেম্বরের শুরু হতে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত (ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি হতে আশ্বিন মাসের শেষ পর্যন্ত)।

খরিপ মৌসুম
মার্চের মাঝামাঝি হতে মধ্য এপ্রিলের মাঝ পর্যন্ত।

লক্ষণীয়
অতিরিক্ত গরম ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ঊভয়ই গোলাপ ফুল চাষে বাধার সৃষ্টি করে।

বংশবৃদ্ধি
কয়েক প্রকার বীজ থেকে গোলাপের চারা তৈরি করা গেলেও চাষের জন্য প্রধানত কলমের চারাই ব্যবহার করা হয়। সাধারণত গুটি কলম, শাখা কলম (কাটিং), চোখ কলম (বাডিং) ইত্যাদি উপায়ে গোলাপের চারা প্রস্ত্তত করা যায়।

ক. গুটিকলমঃ যে গাছের চারা তৈরি করা হবে সে গাছের একটি সুস্থ্য সবল ডালের ৩-৫ সেঃমিঃ পরিমাণ ছাল গোল করে একটি ধারালো ছুরি দিয়ে তুলে দিতে হয়। এরপর দো-আঁশ মাটি ও পচা গোবর সার সমান অংশে মিশিয়ে সেই ছালতোলা জায়গায় মুঠো করে লাগিয়ে দিতে হয়। মাটিটি পরে পরিথিন দিয়ে বেঁধে দিতে হয়। এতে মাটির জল শুকাতে পারে না, তাছাড়া শিকড় বের হলে বাইরে থেকে দেখতে সুবিধা হয়। যদি জল শুকিয়ে যায় তা হলে ইনজেকশানের সিরিঞ্জ দিয়ে জল ঢুকিয়ে দিতে হয়। ৫-৬ সপ্তাহের মধ্যেই শিকড় বের হয়। তখন পলিথিনের বাঁধনের ঠিক নিচে প্রথম দফায় অর্ধেক এবং ২/৩ দিন পর বাকি অর্ধেক আলগা করে কলমটি ২/৩ দিন ছায়ায় রেখে পরে পলিথিনের বাঁধন খুলে মাটিতে লাগাতে হয়।

খ. শাখা কলমঃ শাখা কলম তৈরির জন্য শক্ত ও নিখুঁত শাখা নির্বাচন করতে হয়। প্রায় ২০-২২ সেঃমিঃ লম্বা করে কলমের ডাল এমনভাবে কাটতে হয় যেন উপরের মাথা সমান ও নীচের মাথা অর্থাৎ সে মাথা মাটিতে পোঁতা হবে তা তেছরা থাকে। ডালের নীচের কয়েকটি পাতা ও কাঁটা ভেঙ্গে ফেলে জৈব সার মেশানো ঝুরঝুরে মাটিতে পুঁতে দিয়ে নিয়মিত জলদিতে হয়। ৬/৭ সপ্তাহ সময়ের মধ্যে কলম তৈরি হয়। সেব বিদেশী গোলাপের কাষ্ঠল অংশ কম সেগুলোতে প্রায়ই কলম হতে চায় না।

গ. চোখ কলমঃ চোখ কলম দ্বারা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বহু সংখ্যক চারা উৎপন্ন করা যায়। এ পদ্ধতিতে জংলী গোলাপ গাছের শাখা বা কান্ডের সাথে ভাল জাতের গোলাপের কুঁড়ি বা চোক লাগিয়ে তৈরি করতে হয়। এ পদ্ধতিতে দেশী জংলী গোলাপ গাছকে শিকড় গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কেননা এদের ফুল ভাল মানের না হলেও দেশীয় আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকতে পারে। আষাঢ়-শ্রাবন মাসে জংলী গোলাপের ডাল কেটে কাটিং লাগাতে হয়। আমাদের দেশে কুঁড়ি সংযোজন করার উপযুক্ত সময় হচ্ছে অগ্রহায়ণের প্রথম থেকে মাঘের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

জমি তৈরী
জমি বেশি শুকনো থাকলে হালকা সেচ দিয়ে জো আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জৈব সার মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমির pH ঠিক রাখার জন্য চুন অথবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সার দিতে হবে। জমিতে গভীর চাষ অর্থাৎ ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরতায় জমি চাষ দিতে হবে। পোকা মাকড় মুক্ত রাখতে জমি চাষের সময় ক্লোরডেন এবং মাটি বাহিত রোগ থেকে মুক্ত রাখার জন্য ব্রোমাইড ক্লোরোপিকরিন (১৬২ কেজি /একর) প্রয়োগ করতে হবে। শেষ চাষের সময় পরিমাণমত টিএসপি ও এমওপি সার জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

রোপণ পদ্ধতি
দেশীয় গোলাপ ফুল কাটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে বেড সিস্টেমে লাগিয়ে নির্বাচিত জাতের সায়ন (যে ডাল দিয়ে কলম করা হয়) সংগ্রহ করে বিভিন্ন কলম (জোড় কলম, চোখ কলম ইত্যাদি) পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়। যে চারাটি উৎপন্ন হলো, তার গোড়ায় মাটির বল তৈরী করে নির্দিষ্ট জমিতে লাগানো হয়। চারাটি লাগাতে সাধারণত: ২০ থেকে ৩০ সেমি (৮ থেকে ১২ ইঞ্চি) আয়তনের এবং ২৫ থেকে ৩০ সেমি (১০ থেকে ১২ ইঞ্চি) গর্ত তৈরী করে , তার ভিতর ভালোভাবে বসাতে হয় এবং গর্তটি মাটি দিয়ে ভালোভাবে আটকাতে হবে। যে গাছ দ্রুত বাড়ে তার জন্য ২ ফুট (গাছ থেকে গাছ) এবং ৩ ফুট (সারি থেকে সারির) দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। কলমের নীচের অংশ হতে কোন ডালপালা হতে দেওয়া যাবেনা।

সার প্রয়োগ

কাঁচা গোবর
২০০০ কেজি
জমি তৈরির সময়

জৈব সার
৬০০ কেজি
জমি তৈরির সময়

টিএসপি
৫০ কেজি
জমি তৈরির সময়

এমওপি
২০ কেজি
জমি তৈরির সময়

ইউরিয়া
১০০ কেজি (প্রথম বছর)
চারা লাগানোর ২০ থেকে ২৫ দিন পর

ইউরিয়া
১৫ কেজি
কুঁড়ি বের হওয়ার পূর্বে

দসত্মা
১২ কেজি
জমি তৈরির সময়

খৈল
১৫০ কেজি
জমি তৈরির সময়